বরিশালে করোনায় গ্রাস করেছে মানবতা! মৃত পাগলের দাফন কার্যে অস্বীকৃতি

অবশ্যই পরুন

মৃত্যুর হাতছানি দেয়া করোনা ভাইরাস শুধু আতঙ্কই নয়, বরিশালের সমাজ সামাজিকতাও উল্টোপাল্ট করে দিয়েছে। মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটলেও ধারে কাছে ভিরছে না, সড়কধারে পরে থাকছে। এ যেনো ৭১এর মুক্তিযোদ্ধের বিভর্ষ চিত্রের প্রতিছবি। এমনটি এখন ঘটছে বরিশালের বিভিন্ন প্রান্তে। বিস্ময়কর বা বিড়ল নয়, বিষয়টি স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উজিরপুরের এক পাগলের মৃত্যু পরবর্তী ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। গত ২৫ এপ্রিল শনিবার সন্ধ্যায় উজিরপুরের প্রত্যন্ত পল্লীতে এক ভবঘুরে পাগলের মৃত্যু ঘটলে রাস্তার ধারে তার দেহ পরে থাকলেও কেউ দাফনে এগিয়ে আসেনি। পরবর্তীতে খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা থানা পুলিশ যৌথভাবে অজ্ঞাত পরিচয় মধ্যবয়সী এই ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে। এ সময় একজন সংখ্যালঘু ব্যক্তি তার নিজ বাড়ির পাশে সম্পত্তিতে তাকে দাফনের সম্মতি দিলে আজ ২৬ এপ্রিল সকালে মৃত্যু করোনা রোগীর দাফনের আদলে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। উজিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম এই বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

স্থানীয় জানায়, মানুষিক ভারসাম্যহীন এই ব্যক্তি গত ৪-৫ দিন ধরে উজিরপুরের জল্লা ইউনিয়নে হঠাৎ আবিরভাব ঘটে। এ সময় তাকে স্বাভাবিক দেখা যায়। গত শনিবার সন্ধ্যায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের পীর বাড়ি এলাকায় তার মৃত্যু দেহ পরে থাকতে দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এলাকাবাসীর অলক্ষ্যে আকস্মিক তার মৃত্যু ঘটে। মুহূর্তে ছড়িয়ে পরে করোনা আক্রান্তই তার মৃত্যুর কারণ। ভয়ে দূর থেকে দেখলেও এলাকাবাসী লাশের কাছে ভেরেনি। কেউ দাফনের উদ্যোগও নিতেও চায়নি। এলাকাটি সংখ্যালঘু প্রভাবিত হওয়ায় এবং মৃত্যু ব্যক্তি মুসলিম ধর্ম অনুসারী নিশ্চিত হওয়ায় দেখা দেয় ধর্মীয় বিড়ম্বনা। দাফন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে এক ধরণের অনিহাও প্রকাশ পাওয়ায় সেই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। কিন্তু মানবতা ভুলোণ্ঠিত হলেও কিছু মানুষের বিবেক যে তাড়িত করে তা অনস্বীকার্য। হঠাৎ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি নাম সুশান্ত হালদারের বিবেক জাগ্রত হয়ে অজ্ঞাত এই পাগলের মৃতদেহ দাফনে তার জমি দিতে আগ্রহ প্রকাশ করে বিড়ল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

এদিকে বৈরী আবহাওয়ার মাঝে এই পাগলের মৃতদেহ পরে থাকার দৃশ্য মানবতাকে না কাঁদালেও প্রকৃতিকে কাঁদিয়েছে মুষলধারে বৃষ্টিতে। সংশ্লিষ্ট জল্লা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান বেবী রাণী দাশ নিজেও এ খবর অবগত হওয়ার পরও দায়িত্বশলতার পরিচয় দেয়নি, রাখেনি কোন ভূমিকা। তার অমানবিকতার হেতু কি এমন প্রশ্নে এই প্রতিবেদককে অজুহাত হিসেবে তুলে তার শারীরিক অসুস্থতা। তবে দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর উপেন সরকারকে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে মৃতব্যক্তির দাফনের ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনকে অবহিত করতে। অভিযোগ দায়সারা গোছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণীত বিশ্বাসকে জল্লা ইউনিয়নে এক ব্যক্তির মৃতদেহ পরে থাকার খবর দেয়।

স্থানীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্থানীয় ভারপ্রাপ্ত থানা কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলামকে সাথে নিয়ে বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে সকালে উপজেলা শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরত্বে জল্লার ঘটনাস্থলে পৌছায়। পুলিশ কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম জানান, ওই মৃত ব্যক্তির দাফনের জায়গা দিতে একজন হিন্দ সম্প্রদায়ের ব্যক্তি তাদের কাছে আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি নিজ উদ্যোগে দাফনের কাপড় শহর থেকে ক্রয় করে একটি স্বেচ্ছাসেবক দলকে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌছায়। দুপুরের আগেই বৃষ্টির মাঝে গুটি কয়েক লোকের উপস্থিতিতে জানাজা শেষে পীর বাড়ি গ্রামে সেই মানবতাবাদী উপেন বিশ্বাসের বাড়ি লাগোয়া তার নিজ জায়গায় দাফনকার্য সম্পন্ন হয়।

করোনা ভাইরাস মানুষের জীবন বিয়োগান্তের কিনারায় নিয়ে যাওয়া নয়, তার আগে কেড়ে নিচ্ছে মানবতাকে। গত ২৪ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকালে এধরণের আরো একটি ঘটনা বরিশালবাসীকে বিস্মিত করেছিলো, নিবৃতে কাঁদিয়েছিলো কারো কারো বিবেককে। ওই দিন কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পথে বৃহৎ ওষুধ কোম্পানী বেকসিক্সোর বরিশাল এরিয়া ম্যানেজার শহরতলীর গড়িয়ারপাড় এলাকায় আকস্মিক অসুস্থ্য হয়ে জ্ঞান হারিয়ে সড়কের পাশে পরেছিলো। কি নির্মমতা, সকাল ১০টার দিকে এদৃশ্য স্থানীয়রা প্রত্যক্ষ করলেও ধারণা করা হয়েছিলো তার মৃত্যু ঘটেছে করোনা আক্রান্তে। ফলশ্রুতিতে কেউই সাহায্যর্থে এগিয়ে আসেনি। সেখানকার বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে সেদিনকার পরিবেশ পরিস্থিতির এমন ধারণা পাওয়া গেছে।
অবশ্য বিমান বন্দর থানা পুলিশ খবর পেয়ে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে শেবাচিম মর্গে নিয়ে যায়।

পরে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে জানিয়েছেন নিয়ে আসার পূর্বেই তার জীবনাসান ঘটেছে। স্থানীয়রা অসুস্থ্যতায় পরে থাকাকালীন চিকিৎসা সেবা দিলে সম্ভাবত তার জীবন এভাবে বিপন্ন হতে নাও পারতো বলে চিকিৎসকদের অভিমত পাওয়া গেছে। করোনার এই দূর্যোগে মানবতা ভুলোণ্ঠিত হয়ে যাওয়ায় কাঁদছে বিবেক তবুও কাছে আসতে চায় না নিজের ঝূঁর্কিপূর্ণ আশঙ্কায়-এমন চিত্র শুধু বরিশালে নয়, ইতোপূর্বে কুমিল্লায় করোনায় আক্রান্ত হয়েছে আশঙ্কায় তার নিজ সন্তানরা পিতাকে হাসপাতালের সম্মুখে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। অনুরূপ সর্দ্দি-কাশিতে আক্রান্ত এক বয়বৃদ্ধ জননীকে তার সন্তানরা টাঙ্গাইলের একটি জঙ্গলে ফেলে রেখে গিয়ে গোটা মিডিয়ায় শিরোনাম হয়েছিলো ‘করোনা ভাইরাসে জীবন্ত মানুষের বিবেক খেয়ে ফেলেছে’।

সম্পর্কিত সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

কালকিনিতে বিষাক্ত সাপের ছোবলে মাদ্রাসা ছাত্রের মৃত্যু

মাদারীপুরের কালকিনিতে মাটির গর্তের মধ্যে থেকে মাছরাঙা পাখির ছানা ধরতে গিয়ে বিষাক্ত সাপের ছোবলে আবু হুমাইদ (১১) নামে এক...