মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ : দেশের সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি, প্রশাসন কিংবা সংস্কৃতি—যে কোনো অঙ্গনে চোখ রাখলেই দেখা যায় সাংবাদিকদের অবদান। প্রতিটি ঘটনা জনসম্মুখে পৌঁছে দেওয়ার নীরব অথচ শক্তিশালী মাধ্যম তারা। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সাংবাদিকরা যত বেশি প্রচারের কাজে ব্যবহৃত হন, তত কম কৃতজ্ঞতা পান। প্রচার নিতে সবাই আগ্রহী, কিন্তু ধন্যবাদ দিতে অনীহা—এটাই যেন আজকের বাস্তব চিত্র।
নেতা হোক কিংবা আমলা, সরকারি প্রতিষ্ঠান হোক কিংবা বেসরকারি সংগঠন—সবাই নিজের সাফল্য তুলে ধরতে সাংবাদিকদের শরণাপন্ন হয়। উদ্বোধন, সভা, মানববন্ধন, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড—সব কিছুর জন্য চাই সংবাদ। ক্যামেরা চাই, কলম চাই, শিরোনাম চাই। কারণ প্রচার ছাড়া আজ কোনো কাজেরই মূল্যায়ন হয় না। কিন্তু কাজ শেষ হলেই সেই সাংবাদিকের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। কেউ আর মনে রাখে না, এই খবরটি সংগ্রহ করতে কে রোদে পুড়েছে, কে রাত জেগেছে, কে ঝুঁকি নিয়েছে।
আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো—সংবাদ যদি কারও পক্ষে যায়, তখন সাংবাদিক হয়ে যান “তেলবাজ”। আর যদি বিপক্ষে যায়, তখনই সেই সংবাদ হয়ে যায় “ভুয়া”। এখানে সত্যের মূল্য নয়, নিজের সুবিধার মূল্যই মুখ্য। কেউ আর ভাবতে চায় না, সাংবাদিক তার দায়িত্ব পালন করছেন কি না। বরং সবাই নিজের স্বার্থের পাল্লায় সংবাদকে ওজন করে।
তাহলে প্রশ্ন আসে—সাংবাদিকের আসল সংজ্ঞা কী?
তিনি কি ক্ষমতাবানদের প্রচারযন্ত্র?
নাকি বিরোধীদের অস্ত্র?
নাকি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো এক নিরপেক্ষ কণ্ঠ?
একজন প্রকৃত সাংবাদিক কোনো দলের নয়, কোনো ব্যক্তির নয়—তিনি সত্যের পক্ষে। তার কাজ কারও মন রক্ষা করা নয়, বরং বাস্তবতাকে তুলে ধরা। সমাজে যা ঘটছে, ভালো-মন্দ উভয় দিকই জনগণের সামনে আনা। কারণ অর্ধসত্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি নীরবতাও অপরাধের সামিল।
সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন, কারণ প্রশ্ন না করলে জবাবদিহি থাকে না। তারা অনুসন্ধান করেন, কারণ চোখ এড়িয়ে যাওয়া অনেক সত্য ক্ষমতাকে অস্বস্তিতে ফেলে। তারা লেখেন, কারণ ইতিহাস লেখা হয় ঘটনার ভাষায়, আর সেই ভাষা তৈরি করেন সাংবাদিকরাই।
কিন্তু এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের পোহাতে হয় নানামুখী চাপ। কখনো হুমকি, কখনো অপবাদ, কখনো সামাজিক অবহেলা। অনেক সময় নিজের নিরাপত্তা, পরিবার, এমনকি জীবিকার প্রশ্নও সামনে আসে। তবুও তারা থেমে যান না। কারণ সাংবাদিকতা কেবল পেশা নয়, এটি এক ধরনের দায়বদ্ধতা—সমাজের প্রতি, মানুষের প্রতি।
অথচ এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে তারা খুব বেশি কিছু চান না। না তারা পদক চান, না ক্ষমতা চান। তারা চান শুধু সম্মানটুকু। চান তাদের পেশাটিকে অবিশ্বাসের চোখে না দেখতে। চান সত্য বলার কারণে যেন তাদের “শত্রু” বানানো না হয়।
আজ আমরা মোবাইল খুলে খবর পড়ি, টিভিতে সংবাদ দেখি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিংক শেয়ার করি। কিন্তু খুব কম মানুষই ভাবি—এই খবরটির পেছনে কতটা শ্রম, কতটা সাহস, কতটা সততা জড়িয়ে আছে। একজন সাংবাদিকের একটি প্রতিবেদন অনেক সময় সমাজের ভুল শুধরে দেয়, অন্যায় থামায়, কিংবা নিঃশব্দ মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠে।
সাংবাদিকরা যদি শুধু প্রচারের যন্ত্র হতেন, তাহলে সমাজ এত প্রশ্নহীন হয়ে যেত। তারা যদি সত্য তুলে না ধরতেন, তাহলে দুর্নীতি, অনিয়ম, অবিচার আরও নির্ভয়ে বেড়ে উঠত। তাই সাংবাদিকরা কেবল সংবাদদাতা নন—তারা সমাজের দর্পণ। সেই দর্পণে আমরা নিজেদের চেহারা দেখি, ভালো-মন্দ বুঝি।
কিন্তু দর্পণ ভাঙলে যেমন মুখ দেখা যায় না, তেমনি সাংবাদিকদের অবমূল্যায়ন করলে সমাজও অন্ধ হয়ে পড়ে। সত্য হারিয়ে যায়, গুজব শক্তিশালী হয়, আর বিবেক দুর্বল হয়ে পড়ে।
তাই সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। প্রচার নেওয়ার পাশাপাশি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ শেখার। সমালোচনার পাশাপাশি সম্মান দিতে শেখার। সাংবাদিকদের ভুল হতে পারে—কারণ তারা মানুষ। কিন্তু পুরো পেশাটিকে অপমান করা কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ নয়।
শেষ পর্যন্ত একটাই প্রশ্ন থেকে যায়—
সাংবাদিক কি কেবল শিরোনামের উপকরণ, নাকি জাতির বিবেক?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, আমরা কোন ধরনের সমাজে বাস করতে চাই।
গ্রন্হনা-
সাধারণ সম্পাদক
মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
পিরোজপুর।
