More

    বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বহুমাত্রিক বাস্তবতা: আদর্শ, অবক্ষয় ও প্রত্যাশার গল্প

    অবশ্যই পরুন

    মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ : বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি সমাজের বিবেক, রাষ্ট্রের আয়না এবং মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন, প্রযুক্তির বিস্তার, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সামাজিক বাস্তবতার কারণে সাংবাদিকতার ভেতরে তৈরি হয়েছে নানা ধরণের চরিত্র ও প্রবণতা। এর কিছু ইতিবাচক, কিছু উদ্বেগজনক, আবার কিছু ব্যঙ্গাত্মক বাস্তবতার প্রতিফলন। এই বহুমাত্রিক চিত্রই আজকের বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

    সাইনবোর্ড ও আইডিকার্ড সাংবাদিক: পরিচয়ের আড়ালে পেশার সংকট –
    সমাজে এমন এক শ্রেণির মানুষের দেখা মেলে যারা সাংবাদিকতার নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে। তথাকথিত সাইনবোর্ড সাংবাদিকরা ছোটখাটো অফিস খুলে বা প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। অনেক সময় সাংবাদিক বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও ওঠে তাদের বিরুদ্ধে।

    অন্যদিকে আইডিকার্ড সাংবাদিকরা বৈধ কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র ধারণ করলেও বাস্তবে তাদের সংবাদ কার্যক্রম খুব কম দৃশ্যমান। পরিচয়পত্রকে অনেক সময় তারা প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, যা পেশার মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

    ভুয়া ও মৌসুমী সাংবাদিক: সুযোগসন্ধানী প্রবণতার প্রতিচ্ছবি –
    ভুয়া সাংবাদিকরা সাংবাদিকতার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকগুলোর একটি। সাংবাদিক না হয়েও তারা পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, তদবির কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। এর ফলে প্রকৃত সাংবাদিকদের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
    একইভাবে মৌসুমী সাংবাদিকরা বিশেষ সময়—বিশেষত নির্বাচন বা বড় জাতীয় ঘটনার সময়—হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংবাদপেশাকে তারা দায়বদ্ধতার জায়গা নয়, বরং সাময়িক সুযোগ হিসেবে দেখে।

    প্রেসক্লাব ও শখের সাংবাদিক: পেশা না পরিচয়ের আকর্ষণ?
    কিছু প্রেসক্লাবভিত্তিক সাংবাদিক আছেন যাদের কাছে সাংবাদিকতা মানে মূলত আড্ডা, আলোচনা ও সামাজিক উপস্থিতি। বাস্তব সংবাদ সংগ্রহ বা গবেষণামূলক কাজের চেয়ে তারা সংগঠনকেন্দ্রিক জীবনেই বেশি অভ্যস্ত।
    অন্যদিকে শখের সাংবাদিকরা অন্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন। অনেক ক্ষেত্রে তারা আন্তরিক হলেও পেশাগত প্রশিক্ষণের অভাবে সংবাদ পরিবেশনে মানদণ্ড বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

    বহুমাত্রিক ও কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক: প্রতিভা ও বিতর্ক –
    বহুমাত্রিক সাংবাদিকরা নিজেদের নানা পরিচয়ে পরিচিত করতে ভালোবাসেন—সাংবাদিক, রাজনীতিক, লেখক কিংবা সমাজকর্মী। বহুমুখী দক্ষতা ইতিবাচক হলেও কখনো কখনো এটি পেশাগত মনোযোগকে বিভক্ত করে।
    আরেকদিকে কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক বলতে বোঝানো হয় সেইসব রিপোর্টারকে, যারা তথ্যের অভাবে বা সম্পাদকীয় চাপে সংবাদের মধ্যে কল্পনার রঙ মেশান। এতে সংবাদ ও গল্পের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়, যা গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

    দলীয় ও ভবিষ্যতদ্রষ্টা সাংবাদিক: রাজনৈতিক বাস্তবতার ছায়া –
    বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলীয় সাংবাদিকতা একটি আলোচিত বিষয়। অনেক সাংবাদিক নিরপেক্ষতার পরিবর্তে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে অবস্থান বদলানোর প্রবণতাও দেখা যায়, যা পেশাগত নীতির প্রশ্ন তোলে।
    অন্যদিকে ভবিষ্যতদ্রষ্টা সাংবাদিকরা যাচাই-বাছাই ছাড়াই দূর থেকে নানা তথ্য প্রচার করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে দ্রুত খবর দেওয়ার প্রতিযোগিতা অনেক সময় সত্যতার চেয়ে অনুমানকে গুরুত্ব দেয়।

    অপসাংবাদিক ও স্বার্থপর সাংবাদিক: পেশাগত অবক্ষয়ের সংকেত –
    অপসাংবাদিকতা বলতে বোঝানো হয় পেশাগত দক্ষতা ও নৈতিকতার ঘাটতি। সংবাদ যাচাই, ভাষা ব্যবহার বা দায়িত্বশীল আচরণে দুর্বলতা সাংবাদিকতার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
    আরও উদ্বেগজনক হলো স্বার্থপর সাংবাদিকদের প্রবণতা, যেখানে ব্যক্তিগত সুবিধা বা পদ রক্ষাই হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য। সহকর্মীর ক্ষতি করতেও তারা দ্বিধা করেন না—এমন অভিযোগও শোনা যায়।

    বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত সাংবাদিক: নীরব সংগ্রামের গল্প –
    সব নেতিবাচকতার মাঝেও রয়েছেন বঞ্চিত সাংবাদিকরা, যারা নীতি ও আদর্শ ধরে রেখে নীরবে কাজ করে যান। প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা না পেলেও তারা সত্য প্রকাশের চেষ্টা চালিয়ে যান। অনেক সময় তাদের শ্রম স্বীকৃতি পায় না, তবুও তারা দায়িত্ববোধে অটল থাকেন।
    অন্যদিকে লাঞ্ছিত সাংবাদিকরা নানা হুমকি, হামলা ও চাপের মুখে কাজ করেন। ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর বিরাগভাজন হওয়ায় তাদের পেশাগত জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবুও তারা সমাজের সত্য তুলে ধরার চেষ্টা চালিয়ে যান—যা সাংবাদিকতার সাহসী দিককে তুলে ধরে।

    কাঙ্ক্ষিত সাংবাদিক: সমাজের প্রয়োজনীয় আলোকবর্তিকা –
    সব শ্রেণিবিভাগের শেষে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়—কাঙ্ক্ষিত সাংবাদিক। সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ, শিক্ষিত ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সাংবাদিকই সমাজের প্রকৃত প্রয়োজন। তারা তথ্যকে অস্ত্র নয়, দায়িত্ব হিসেবে ব্যবহার করেন। তাদের কলম বিভাজন নয়, সচেতনতা সৃষ্টি করে।

    দালালি সাংবাদিকতা:নৈতিকতার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন –
    দালালি সাংবাদিকতা নিয়ে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। যখন সংবাদ ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ রক্ষার মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন গণমাধ্যমের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। এটি শুধু পেশার ক্ষতি করে না, জনগণের আস্থাকেও ধ্বংস করে।

    শেষকথা –
    বাংলাদেশের সাংবাদিকতা আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এখানে যেমন অবক্ষয়ের চিত্র আছে, তেমনি আছে সাহস, সততা ও আদর্শের আলো। সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেইসব মানুষের উপর, যারা সত্যকে ভয় পায় না এবং দায়িত্বকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখে।
    কারণ শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতা কোনো পরিচয়পত্র নয়—এটি একটি বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাস রক্ষাই একজন প্রকৃত সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় অর্জন।

    লেখক – সাংবাদিক ও কলামিস্ট
    সাধারণ সম্পাদক
    মঠবাড়িয়া প্রেসক্লাব
    পিরোজপুর।

    সম্পর্কিত সংবাদ

    সর্বশেষ সংবাদ

    Как инновации способствуют находить соратников

    Как разработки помогают обнаруживать единомышленников Современные инновации фундаментально трансформировали формы взаимодействия между индивидами, создав беспрецедентные перспективы для поиска тех, кто...