নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ বাংলাদেশ। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল আর হাজার বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন— প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সৌন্দর্যের এমন বৈচিত্র্য পৃথিবীর খুব কম দেশেই আছে। কিন্তু এই অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও বাংলাদেশের পর্যটন খাত কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, সমন্বয়হীনতা আর প্রচারের অভাবে বিদেশি পর্যটক তো বটেই, দেশীয় পর্যটক টানতেও হিমশিম খাচ্ছে এই শিল্প। তথ্য বলছে, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক এসেছে মাত্র ৮৬ লাখ।
পরিসংখ্যানের আড়ালে স্থবিরতা
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে যেখানে বিদেশি পর্যটক ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ লাখ ৬০ হাজারে। ৩০ বছরে এই প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক পর্যটন বাজারের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল বা মালদ্বীপ যেখানে পর্যটনকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও জিডিপির মাত্র ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এই খাত থেকে অর্জন করছে।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত ৩০ বছরে দেশে সব মিলিয়ে প্রায় ৮৬ লাখ বিদেশি পর্যটক এসেছেন। বছরভিত্তিক পর্যটকের সংখ্যা হলো— ১৯৯৫ সালে ১,৫৬,০০০ জন, ১৯৯৬ সালে ১,৬৬,০০০ জন। ১৯৯৭ সালে ১,৮২,০০০ জন। এছাড়া ১৯৯৮ সালে ১,৭২,০০০, ১৯৯৯ সালে ১,৭৩,০০০, ২০০০ সালে ১,৯৯,০০০, ২০০১ সালে ২,০৭,০০০, ২০০২ সালে ২,০৭,০০০, ২০০৩ সালে ২,৪৫,০০০, ২০০৪ সালে ২,৭১,০০০, ২০০৫ সালে ২,০৮,০০০, ২০০৬ সালে ২,০০,০০০, ২০০৭ সালে ২,৮৯,০০০, ২০০৮ সালে ৪,৬৭,০০০, ২০০৯ সালে ২,৬৭,০০০, ২০১০ সালে ১,৩৯,১০৬, ২০১১ সালে ১,৫৬,৫৪৫, ২০১২ সালে ১,৫৯,৫২৪, ২০১৩ সালে ১,০৪,০০৯, ২০১৪ সালে ১,৩৩,৯০২, ২০১৫ সালে ২,৬১,৪১৬, ২০১৬ সালে ৪,০০,৬৫৯, ২০১৭ সালে ৫,০০,৮৬৫, ২০১৮ সালে ৫,৫২,৭৩০, ২০১৯ সালে ৬,২১,১৩১, ২০২০ সালে ১,৮১,৫১৮, ২০২১ সালে ১,৩৫,১৮৬, ২০২২ সালে ৫,২৯,২৬৮, ২০২৩ সালে ৬,৫৫,৪৫১ ও ২০২৪ সালে ৬,৬০,০০০ জন।
কেন পিছিয়ে বাংলাদেশ?
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা এই খাতের পিছিয়ে থাকার পেছনে ৭টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:
অবকাঠামোগত দুর্বলতা: পর্যটন সক্ষমতায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। শিয়ার মধ্যে শুধু পাকিস্তান ছাড়া বাকি সব দেশ থেকেই পিছিয়ে আছি আমরা। যাতায়াত ব্যবস্থায় উন্নতি হলেও দীর্ঘ যানজট ও মানহীন রাস্তাঘাট পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করে। পর্যাপ্ত হোটেলের সুব্যবস্থাও নেই।
আকাশপথের সীমাবদ্ধতা: বিদেশি পর্যটকদের কাছে নিজের দেশকে প্রমোট করতে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বিমান ব্যবস্থার দিক থেকে আমাদের অবস্থান ১১১তম। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এশিয়ার বাইরে শুধু লন্ডনে ফ্লাইট পরিচালনা করে। ফলে ইউরোপ-আমেরিকার পর্যটকদের জন্য পরিবহন ব্যয় অনেক বেশি।
প্রচারের অভাব: বিশ্বদরবারে দেশের পর্যটন ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য কার্যকর কোনও ডিজিটাল বা বৈশ্বিক প্রচার নেই।
নিরাপত্তার সংকট: বিদেশি পর্যটকদের কাছে সুরক্ষা ব্যবস্থা অনেক বড় একটি ইস্যু। পর্যটন এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও হয়রানি রোধে ‘ট্যুরিস্ট পুলিশ’ থাকলেও বিদেশি পর্যটকদের মাঝে আস্থার সংকট কাটেনি।
উচ্চ ব্যয় ও নিম্নমান: পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের হোটেল-রেস্তোরাঁর খরচ বেশি, কিন্তু সেবার মান সেই তুলনায় নগণ্য।
সমন্বয়হীনতা: ট্যুরিজম বোর্ড, পর্যটন করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কাজের কোনও সমন্বয় নেই।
তথ্য ও দক্ষ জনবলের অভাব: সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায় না এবং পর্যটন সেবায় নিয়োজিতদের পেশাদারিত্বের অভাব প্রকট। ট্যুরিজম বোর্ড, পর্যটন করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে কাজের কোনও সমন্বয় নেই।
পশ্চিমা দেশের পর্যটকের অভাব
বাংলাদেশে পর্যটকদের বেশিরভাগই আসে ভারত থেকে। মাত্র ৫ শতাংশ পর্যটক ইউএসএ থেকে এলেও বেশির ভাগই রয়েছে প্রবাসী বাঙালি। বিশ্বব্যাপী পর্যটন বাজারের ৫৩ শতাংশ আসে আমেরিকা এবং ইউরোপ থেকে, যা থেকে আমরা অনেকটাই বঞ্চিত। এশিয়ার বাইরে থেকে আসা পর্যটকের হার শতকরা ২০ শতাংশ থেকে ৭১ শতাংশ, যেখানে আমাদের দেশের হার মাত্র ৭ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ নুজহাত ইয়াসমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাদের বড় সমস্যা হলো পর্যটন এলাকাগুলোর ‘ধারণক্ষমতা’ নির্ধারণ করতে না পারা। যেখানে ১ হাজার জনের জায়গা, সেখানে ২০ হাজার যাচ্ছে। এছাড়া যাতায়াত ও থাকা-খাওয়া অনেক ব্যয়বহুল।”
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আজম কোরেশী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা সমস্যাগুলো জানি, সেমিনারে আলোচনাও হয়; কিন্তু বাস্তবায়নে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। নতুন সরকার যদি পর্যটনকে গুরুত্ব দিয়ে এসব সংকট সমাধান করে, তবেই বিদেশি পর্যটক আসবে।”
কক্সবাজারের রিসোর্ট মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি কাজী রাসেল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কক্সবাজার বিমানবন্দর আধুনিকায়নের কাজ শেষ হলে সম্ভাবনা বাড়বে। তবে বিদেশি পর্যটকদের জন্য সৈকতে আলাদা জোন বা বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, “পর্যটনে বড় সমস্যা সমন্বয়ের অভাব। একটি পর্যটন এলাকায় সরকারের ট্যুরিজম বোর্ড, পর্যটন করপোরেশন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, সিটি করপোরেশন বা নগর কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার কাজ রয়েছে। কিন্তু কারও সঙ্গে কারও সমন্বয় নেই।”
এদিকে বাংলাদেশ হোটেল-রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ফিরোজ আলম সুমন বলেন, পর্যটনের স্থানগুলোতে নিরাপত্তাসহ সবধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এই সেক্টরকে সবসময় সম্ভাবনাময় বলে থাকলেও সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সঠিকভাবে কাজ করছি না।” এই সেক্টরের সঙ্গে জড়িত সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থা এক হয়ে কাজ করলেই কেবল উন্নয়ন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
উত্তরণের পথ
বেকারত্ব দূরীকরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পর্যটন শিল্পের বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকারি-বেসরকারি সকল সংস্থাকে এক ছাতার নিচে এসে একটি ‘মাস্টার প্ল্যান’ বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর (ইউরোপ-আমেরিকা) পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং শুল্কমুক্ত বিপণি বিতানের মতো সুবিধা বাড়ানো জরুরি।
