More

    কীর্তনখোলার সকালে সেই পুরনো সাইরেন

    অবশ্যই পরুন

    বরিশাল শহরের বধ্যভূমিসংলগ্ন ত্রিশ গোডাউন এলাকার সকালটি তখনও নিস্তব্ধ। কীর্তনখোলার জলের ওপর কুয়াশার স্বচ্ছ পাতলা আস্তরণ। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে এলো পুরনো সুর, স্টিমারের সাইরেন। এই শব্দে মুহূর্তেই নদীর সকাল বদলে গেল। যেন বহুদিনের ঘুম ভাঙল কীর্তনখোলার, আর শহরের মানুষের মনে টোকা দিল সঞ্চিত স্মৃতি।

    এই ফিরে আসা স্টিমারটি হলো পিএস মাহসুদ, যা কেবল একটি পরিবহন নয়, বরিশালের মানুষের স্মৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এক টুকরো ইতিহাস। ১৯৩৮ সালে নির্মিত স্টিমারটি ২০২০ সাল পর্যন্ত নিয়মিত চলাচল করেছে, এরপর নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এর যাত্রীসেবা থেমে যায়। সংস্কারের পর গত ১৫ নভেম্বর ঢাকার সদরঘাটে নৌপরিবহন উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন এটি উদ্বোধন করেন। পিএস মাহসুদের চেহারা আজও ভারী ও রাজকীয়।

    এর কাঠের ডেক, পালের গঠন এবং ধাতব চাকা—সবকিছুই যেন কোনো জাদুঘরের স্মারক। তবে যাত্রীদের আরাম দিতে এর ভেতর নতুন করে সাজানো হয়েছে কেবিন, নিয়ন্ত্রণকক্ষ। নিশ্চিত করা হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। স্মৃতির ভেলায় ভাসমান যাত্রী একসময় ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে স্টিমারের ওপরই ছিল যাত্রীদের প্রধান ভরসা। ধীরে চলা, ডেকে রাত কাটানো এবং নদীর ভোর দেখার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল এক নদীসংলগ্ন সংস্কৃতি। বরিশাল শিক্ষাবোর্ডে সাবেক চেয়ারম্যান মো. আব্বাস উদ্দিন খান বন্ধুদের এগিয়ে দিতে এসে জানান, এই স্টিমারের সঙ্গে তাদের অনেক স্মৃতি জড়িত এবং ভিড় দেখলে তার ভালো লাগে। ৭৭ বছর বয়সী নার্গিস রফিকা রহমান ৬৩ বছর পর আবার ঢাকার পথে এই স্টিমারে উঠেছেন।

    তিনি বলেন, ‘১৯৬২ সালে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় শেষবার উঠেছিলাম। এত বছর পর নৌপথে কেমন লাগে, সব আবার দেখতে চাই।’ ৫৫ বছর বয়সী রওশন আরা বেগম দীর্ঘক্ষণ স্টিমারের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলেন, ‘স্টিমার যেতে দেখলে বুকের ভেতর যেন টান পড়ে।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, সময় বদলালেও নদী কিন্তু আগের মতোই আছে। দ্রুতগামী লঞ্চ ও উন্নত সড়কের ভিড়ে মানুষ এখনও ধীর লয়ের স্টিমার ভ্রমণের সেই শান্তি খুঁজে বেড়ায়, আর নদীর ভোরের আলোয় চোখ মেলার অনুভূতি চায়। কীর্তনখোলার বাতাসে আজও জীবনানন্দ দাশের সেই নদীর ভোর ভেসে থাকে।

    যাত্রাপথের চিত্র ও ‘কাটলেট’ এর পুরনো স্বাদ প্রথম যাত্রার ফিরতি পথে স্টিমার পিএস মাহসুদ শনিবার সকালে রওনা দিয়ে রাতেই ঢাকায় পৌঁছেছে। বিআইডাব্লিউটিসির বরিশাল টার্মিনাল সুপারিনটেনডেন্ট সোহেল খান জানান, যাত্রীসংখ্যা ছিল ‘খুবই আশাব্যঞ্জক’। এই যাত্রায় প্রথম শ্রেণিতে ১৬ জন, দ্বিতীয় শ্রেণিতে দুইজন এবং শোভন শ্রেণিতে দুইজন যাত্রী ছিলেন। ঢাকা থেকে বরিশালে আসা ১৪ জন যাত্রী ফিরতি পথে শনিবার রাতে ঢাকায় ফিরেছেন। সাংবাদিকরা যখন সকালে ত্রিশ গোডাউন এলাকার অস্থায়ী টার্মিনালে পৌঁছান, তখন একটু একটু করে ঘাট জমতে থাকে।

    ২০ জন যাত্রী যখন স্টিমারে ওঠেন, তখন ঐতিহ্যবাহী লাল গালিচা বিছিয়ে তাঁদের স্বাগত জানানো হয়। স্টিমারের নিচতলায় কর্মীরা তখন নাস্তার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, আর রান্নার গরম ভাপ ঘাটের কুয়াশার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল। এই স্টিমার যাত্রার এক বিশেষ আকর্ষণ হলো ফিশ ‘কাটলেট’। কবি হেনরী স্বপন জানান, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যখন তিনি তৃতীয় শ্রেণির যাত্রী হয়ে বই কিনতে ঢাকায় যেতেন (তখন ভাড়া ছিল প্রায় ৫০ টাকা), তখন সেই কাটলেটই ছিল তার প্রধান টান।

    কাটলেটের দাম তখন ভাড়ার চেয়েও বেশি ছিল। টুনা ও সামুদ্রিক মাছ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা এই কাটলেট পরিবেশন করা হতো কাটা চাকু, ছুরি ও সসের সঙ্গে। এই নতুন যাত্রায়ও কাটলেট ছিল। এক যাত্রী ১৫০ টাকায় কাটলেট, ৫০০ টাকায় ব্রেকফাস্ট এবং ৫০০ টাকায় দুপুরের খাবার খান, যার মোট বিল দাঁড়ায় এক হাজার ২৩০ টাকা। যদিও বিলের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল, তবে কাটলেটের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হেরিটেজ ক্রুজ হিসেবে পথচলা শুক্রবার রাতের অন্ধকারে স্টিমার পৌঁছানোর কারণে অনেকে সেটি ভালোভাবে দেখতে পারেননি।

    তাই শনিবার সকাল থেকেই ঘাটে মানুষের ভিড় জমতে থাকে। কেউ ভিডিও করছিলেন, কেউ ছবি তুলছিলেন, আর কেউ চুপচাপ তাকিয়ে দেখছিলেন, যেন নদীর বুক থেকে ফিরে আসা কোনো পুরনো পরিচিত মুখ দেখছেন। বিআইডাব্লিউটিসির পরিদর্শক জসিম উদ্দিন সিকদার বলেন, “আপাতত সংস্থাটিই স্টিমার পরিচালনা করছে। তবে দুই দফা টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং লিজ মিলে গেলে এটি ‘হেরিটেজ ক্রুজ’ হিসেবে চলবে।”

    সম্পর্কিত সংবাদ

    সর্বশেষ সংবাদ

    Patient_reflexes_are_key_when_helping_your_chicken_cross_the_chickenroad_safely

    Patient reflexes are key when helping your chicken cross the chickenroad safely from speeding carsUnderstanding the Core Gameplay LoopDifficulty...