সমাজসেবা অধিদপ্তর গত অর্থ বছরে বরিশালের সুবিধা বঞ্চিত প্রায় সোয়া ৯ লাখ মানুষের মাঝে সাড়ে ৭শ কোটি টাকার সরকারি নগদ আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেছে। এ অঞ্চলের প্রায় ৯১ লাখ মানুষের ১০ ভাগেরও বেশি বর্তমানে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারি আর্থিক সুবিধা লাভ করছেন। এমনকি এ অঞ্চলের ৫ শতাধিক বেসরকারি এতিমখানার প্রায় ১৫ হাজার এতিম শিশু-কিশোরদের জন্যও সরকারি প্রায় ৩৬ কোটি টাকার ‘ক্যপিটেশন গ্রান্ট’ বিতরণ করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
নেই পাশে কেউ যার-সমাজসেবা আছে তার’ প্রতিপাদ্য নিয়ে বরিশালে সমাজসেবা দিবস উপলক্ষে ‘আত্ম অনুসন্ধান’ শীর্ষক ইভেন্ট প্রফাইলে এ সব তথ্য উঠে এসেছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) বরিশাল সমাজসেবা কমপ্লেক্স প্রাঙ্গনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার-রাজস্ব ও যুগ্ম সচিব মোঃ সোহরাব হোসেন।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ পরিচালক একেএম আখতারুজ্জামান তালুকদারের সভাপতিত্বে অধিপ্তরের বরিশাল বিভাগের পরিচালক শাহ মোঃ রফিকুল ইসলাম ও বরিশালের পুলিশ সুপার ফারজানা ইসলাম বিশেষ অতিথি ছিলেন। সভায় জানান হয়, ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী’র বাইরে সমাজ সেবা অধিদপ্তর ‘দারিদ্র বিমোচন ঋণ কার্যক্রম’র আওতায় পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রম, সুদমুক্ত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, পল্লী মাতৃকেন্দ্রের কার্যক্রম এবং দগ্ধ ও প্রতিবন্দী ব্যক্তিদের পূণর্বাশন কার্যক্রম’র আওতায়াও বরিশাল সহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে শুরু করে সুদুর পল্লী এলাকায়ও জনসেবা মূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলার ১০টি বালক ও বালিকা শিশু পরিবার, সামাজিক প্রতিবন্দী মেয়েদের প্রশিক্ষন ও পূণর্বাসন কেন্দ্র, এতিম, প্রতিবন্দী ও দুস্থ মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্দী শিক্ষা কার্যক্রম ও দৃষ্টি প্রতিবন্দী বিদ্যলয় ছাড়াও মহিলা ও শিশু-কিশোরী হেফাজতীদের নিরাপদ আবাসন কেন্দ্র সমুহে দেড় সহশ্রধিক আবাসন সুবিধা রয়েছে। তবে এরমধ্যে বর্তমানে নিবাসীর সংখ্যা মাত্র সাড়ে ৭শ জনের মত।
এছাড়া সুদুর আগৈলঝাড়াতে ১শ অনাথ ও বেওয়ারিশ শিশুদের আবাসন ও পূণর্বাসন সুবিধা থাকলেও সেখানে মাত্র ১৩টি শিশু রয়েছে। মূলত জেলা ও মহানগর থেকে অনেক দুরত্বের এ প্রতিষ্ঠানটি এখনো সমাজের দৃষ্টির আড়ালেই রয়ে গেছে।
তবে সমাজসেবা অধিদপ্তর এসব কিছুর বাইরেও ক্যন্সার, কিডনি সমস্যা, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোক পক্ষাঘাতগ্রস্থ, জন্মগত হ্রদরোগ ও থ্যলাসেমিয়া আক্রান্ত প্রায় ৩ হাজার মনুষের চিকিৎসা সহায়তা বাবদ গত অর্থ বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করেছে বলে জানা গেছে। এছাড়া বরিশাল বিভাগের ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬৭৪ জনকে বয়স্ক ভাতা, প্রায় ২.২০ লাখ বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতাকে ভাতা, ২.৩১ লাখকে প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রায় ৮ হাজারকে অনগ্রসর বিশেষ ভাতা, সাড়ে ৬ হাজার প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি, ৩,১৩৭ জনকে অনগ্রসর শিক্ষা উপবৃত্তি, ৮৭৪ জন বেদেকে বিশেষ ভাতা, ৬৮৬ জন বেদেকে শিক্ষা উপবৃত্তি, ১০৩ হিজরাকে ভাতা ও ২৯ হিজরাকে শিক্ষা উপবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে বলে জানা ।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এসব ভাতা প্রাপ্তগনের মধ্যে মাসে সাড়ে ৬শ টাকা করে বয়স্কভাতা, ৯শ টাকা করে প্রতিবন্দী ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা, হিজরা জনগোষ্ঠী এবং হিজরা জনগোষ্ঠীর বিশষভাতা ও ৫০ ঊর্ধ্ব অনগ্রসর জনগোষ্ঠী মাসে সাড়ে ৬শ টাকা করে ভাতা পচ্ছেন। এছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি বাবদ প্রাথমিকস্তরে মাসে ৯শ টাকা, মাধ্যমিক স্তরে ৯৫০ টাকা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ১,০৫০ টাকা স্নাতক থেকে স্নাতকোত্তর স্তরে সাসে ১,৩০০টাকা করে ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। হিজরা শিক্ষা উপবৃত্তি বাবদও প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তরে ৭শ টাকা থেকে ১২শ টাকা করে বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। এমনকি অনগ্রসর শ্রেণীর শিক্ষা উপবৃত্তি বাবদও একইহারে ভাতা প্রাদান করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
বরিশাল বিভাাগের ৫০১টি বেসরকারি এতিমখানার ১৪ হাজার ৯২২টি শিশুকে গত অর্থ বছেরে ৩৫ কোটি ৮১ লাখ ২৮ হাজার টাকার ক্যাপিটেশন গ্রান্ট প্রদান করা হয়। এ কার্যক্রমের আওতায় প্রতিটি এতিম শিশুদের ভরনপোষনের জন্য মাথাপিছু মাসে ২ হাজার টাকা করে নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এমনকি শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতায় ৬ থেকে ৮ বছর পর্যন্ত এতিম ও দুঃস্থ শিশুদের অন্ন,বস্ত্র, শিক্ষা,স্বাস্থ্য,বাসস্থান ও চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে পূণর্বাসন করা হচ্ছে। এ খাতেও শিশু প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা করে বরাদ্ব রয়েছে।
এ সব খাতে চলতি অর্থ বছরেও সরকার আরো বরাদ্ব বৃদ্ধি করেছে। ফলে সারা দেশের মত দক্ষিণাঞ্চলেও সমাজে পিছিয়ে পরা মানুষ ও প্রতিবন্দী সহ সামাজিক প্রতিবন্ধীরা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখছে। অনেক শিক্ষা বঞ্চিত শিশু-কিশোর শিক্ষার আলো দেখতে পাচ্ছে। এমনকি ইতোমধ্যে বরিশালের বিপুল সংখ্যক সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের পূনর্বাসনও সম্ভব হয়েছে। তারা সামাজিকভাবে বেঁচে থাকার অবলম্বন পেয়েছে। এ সব কারণেই সমাজ সেবা অধিদপ্তরও ‘সমাজসেবায় গড়বো দেশ-নতুন হবে বাংলাদেশ’ শ্লোগান নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনে সমাজসেবা অধিদপ্তর আরো সমৃদ্ধ ও সুখি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বরিশালে এবার সমাজসেবা দিবস পালন করল।
