আরিফ আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক : দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)-তে শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এই অচলাবস্থা দূর করতে দ্রুত সময়ের মধ্যে শিক্ষক, উপাচার্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিকে নিয়ে জরুরি বৈঠকের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা বলেন, “আমরা শিক্ষকদের দাবিকে যৌক্তিক মনে করছি। তবে এটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ নিয়ে উপাচার্যের ভূমিকা কতদূর, তা আমরা বুঝি না। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথেও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে উপাচার্য কক্ষ ও আন্দোলনরত শিক্ষকদের পাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছি। তাছাড়া স্বামী-স্ত্রী দুজন শিক্ষক একই প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকাটাও অন্যদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে। তাই জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। তা না হলে আমাদের সেশনজট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।”
গত প্রায় তিন মাস ধরে একের পর এক আন্দোলন, কর্মবিরতি, অসহযোগ, অনশন ও একাডেমিক অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে ববি। কখনো শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, কখনো চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের, আবার কখনো শিক্ষকদের আন্দোলনে অস্থির হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস।
সর্বশেষ গত ২১ এপ্রিল থেকে ৬০ জন শিক্ষকের পদোন্নতি জটিলতা ঘিরে শুরু হওয়া সংকট এখন প্রশাসনিক অচলাবস্থা, শিক্ষক-প্রশাসন মুখোমুখি অবস্থান এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পরিবেশকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। এরই মধ্যে শ্রেণিকক্ষে তালা, উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, অনশন কর্মসূচি এবং ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিতের মতো ঘটনাও ঘটেছে ক্যাম্পাসে।

এদিকে ৭২ জন শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন বলে প্রচারণা চালিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হয়েছে। যদিও এ পদত্যাগের বিষয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। অনেক শিক্ষক জানিয়েছেন, তারা কোনো পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেননি। অন্যদিকে ববির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম জানিয়েছেন, তিনি এখন পর্যন্ত মাত্র তিনজন শিক্ষকের পদত্যাগপত্র পেয়েছেন। গণমাধ্যমে যে সংখ্যার কথা বলা হচ্ছে, তার পক্ষে এখনো কোনো লিখিত বা আনুষ্ঠানিক তথ্য তার কাছে নেই।
আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সব ধরনের যোগ্যতা অর্জনের পরও ৬০ জন শিক্ষক সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা ও যোগ্যতা পূরণ করলেও বছরের পর বছর ধরে তাদের পদোন্নতি ঝুলে আছে।
শিক্ষক সমাজের একটি অংশ দাবি করছে, প্রশাসনিক জটিলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণেই এ সংকট দীর্ঘ হয়েছে।
পরিস্থিতি প্রথমে সীমিত কর্মসূচির মধ্যে থাকলেও ধীরে ধীরে তা বড় আন্দোলনে রূপ নেয়। শিক্ষকরা কালোব্যাজ ধারণ, মানববন্ধন, কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচি পালন করেন। পরবর্তীতে পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক শাটডাউন ঘোষণা করা হয়। এতে কয়েকটি বিভাগের ক্লাস-পরীক্ষা কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, আন্দোলনের অংশ হিসেবে কিছু শ্রেণিকক্ষে তালাও দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, শিক্ষকদের আন্দোলনের ফলে শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিষয়টি শিক্ষকদের সবার আগে ভাবা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষকদের মধ্যে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ধীমান কুমার, অধ্যাপক মোহসীন উদ্দীন, সহযোগী অধ্যাপক হাফিজ আশরাফুল হক, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ইসরাত জাহান, আইন বিভাগের ডিন সরদার কায়সার আহমেদ, মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দীনসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের চর্চা অনুযায়ী আপগ্রেডেশন বোর্ডের সভার পরপরই সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং আইন অনুযায়ী বোর্ডের সুপারিশ অনুমোদনের পরই আপগ্রেডেড পদ কার্যকর হয়। কিন্তু উপাচার্য মোহাম্মদ তৌফিক আলম বোর্ডের সুপারিশ অনুমোদনের জন্য সিন্ডিকেট সভা আহ্বান না করে টালবাহানা করছেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সাল থেকে যোগ্যতা অর্জনকারী সহকারী অধ্যাপকদের সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য আপগ্রেডেশন বোর্ডের সভাও আয়োজন করা হয়নি। ফলে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদোন্নতির বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ইউজিসি গত ৩ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে চিঠি পাঠিয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় উপাচার্য মোহাম্মদ তৌফিক আলম ইউজিসির সঙ্গে এমন কিছু সমঝোতা করেছেন, যার ফলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী নয়; বরং ইউজিসির নির্দেশনা ও উপাচার্যের মতামত অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন সাধারণ শিক্ষক বলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সিন্ডিকেট সভা হলেও কার্যকর সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রশাসনের দূরত্ব বাড়তে বাড়তে পরিস্থিতি সংঘাতময় হয়ে উঠেছে। একপর্যায়ে শিক্ষক সমাজের একটি অংশ উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।
গত এক মাসে ক্যাম্পাসে অন্তত কয়েক দফা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল ও পাল্টা অবস্থানের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ক্লাস-পরীক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় নতুন করে সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীরা চাকরির বয়সসীমা ও উচ্চশিক্ষার আবেদন নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন।
১৩ মে সরেজমিনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, উপাচার্য ও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট হয়েছে যে, এই পদোন্নতির দাবিদার শুধু শিক্ষকরা নন; ববির প্রায় ৬০০ শিক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরাও একই সমস্যায় রয়েছেন। তবে আন্দোলন করছেন শুধু শিক্ষকরা। আর এর নেপথ্যে রয়েছে শিক্ষকদের গ্রুপিং রাজনীতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরেই কয়েকটি শিক্ষক গ্রুপ সক্রিয়। এদের একটি অংশ পলাতক ও নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন। আবার বর্তমানে তারাই বিএনপির সমর্থিত শিক্ষকদের ঘনিষ্ঠজন হয়ে বিভিন্ন জটিল পরামর্শ দিচ্ছেন। কেউ কেউ জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির সমর্থক বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দলমত-নিরপেক্ষ সাধারণ শিক্ষকদের একটি অংশ মনে করছেন, উপাচার্য পরিবর্তন করে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতেই এটি বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলন। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসনিক নিয়োগ, পদোন্নতি, সিন্ডিকেটে প্রভাব এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি আরও প্রকট হয়েছে বলেও তারা মনে করেন।
সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একটি বড় অংশের মতে, বর্তমান সংকট কেবল পদোন্নতির নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অসন্তোষ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ।
শিক্ষার্থীদের ভাষায়, “বিশ্ববিদ্যালয় এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে আন্দোলনের মাঠে বেশি পরিণত হয়েছে।”
তাদের অভিযোগ, শিক্ষক-প্রশাসন দ্বন্দ্বের বলি হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ জরুরি। কারণ, শিক্ষামন্ত্রী এলে ইউজিসিও সক্রিয় হতে বাধ্য হবে বলে মনে করছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক বিভাগে শিক্ষক সংকট রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিছু বিভাগে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় খণ্ডকালীন শিক্ষকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
আন্দোলনরত শিক্ষকদের পক্ষে জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, “আমাদের এই দাবি গত পাঁচ বছর ধরে চলে আসছে। বর্তমান উপাচার্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কথা বলেছেন। ফলে তার ওপর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা এখন আর তার কোনো কথায় বিশ্বাস রাখতে পারছি না।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হচ্ছে, তা আমরা স্বীকার করছি। তবে আমরা কখনো চাই না শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলনের অংশ হোক। আমি তাদের অনুরোধ করব, তোমরা ধৈর্য ধরো, কোনো অযৌক্তিক বা অন্যায়ের পক্ষে যেও না। বন্ধের দিনগুলোতে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে আমরা ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন, খুব দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান আসবে।
এদিকে ববির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, “আমাদের শিক্ষকরা ইউজিসির যে চিঠির কথা বলছেন এবং যে নীতিমালা অনুসরণে অনিহা প্রকাশ করছেন, তা দেশের প্রায় ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় অনুসরণ করছে। এখন শুধু আমাদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া সম্ভব নয়। তাহলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের আন্দোলন শুরু হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ইউজিসির সঙ্গে আমার কোনো বিশেষ ঘনিষ্ঠতা নেই—এ কথাও তো আমাদের শিক্ষকরাই বলছেন। সমঝোতা বা আলোচনার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সবকিছু আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব।”
শিক্ষকদের আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তিনি তাদের সহনশীল আলোচনায় বসার আহ্বান জানান।
বরিশাল অঞ্চলের শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিশিষ্টজনরা মনে করছেন, দ্রুত ত্রিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করা উচিত। একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বামী-স্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, এসব বিষয় সমাধান না হলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠান এখন সংকট উত্তরণের অপেক্ষায়। এ জন্য জরুরি ভিত্তিতে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বরিশালের শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরাও।
