More

    এখনও খোলা আকাশের নিচে কড়াইলবাসী, সরকারি সহায়তার অপেক্ষা

    অবশ্যই পরুন

    এখনও খোলা আকাশের নিচে কড়াইলবাসী, সরকারি সহায়তার অপেক্ষা রাজধানীর বনানীর কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের পর পেরিয়ে গেছে চার দিন। এখনও খোলা আকাশের নিচে দিনযাপন করছেন ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী। অর্থের অভাবে তুলতে পারছেন না ঘর।

    সরকার, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, এনজিও এবং ব্যক্তি উদ্যোগে খাদ্য সহায়তা ও ত্রাণ দেওয়া হলেও তা বস্তিবাসীর জন্য অপ্রতুল। এই দুরবস্থা থেকে বাঁচতে সরকারের সহায়তার পথ চেয়ে আছেন তারা। বস্তিবাসী বলছেন, তাদের অধিকাংশই ভাড়া থাকেন। টাকার অভাবে বাড়িওয়ালারা রুম তুলে দিতে পারছেন না। এছাড়া তাদের খাবার সংকটও দেখা দিয়েছে। রাত হলে শীতের মধ্যে শিশুদের নিয়ে থাকতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে। এতে বাচ্চারাও আক্রান্ত হচ্ছে ঠান্ডাজনিত রোগে।

    এদিকে বস্তির বাড়িওয়ালা যারা রয়েছেন, তারাও আর্থিক সংকটের কারণে ঘর তুলতে পারছেন না। তাদের দাবি, আগের আগুনে (২০১৭ সালে) যখন সব পুড়ে গিয়েছিল, তখন অনেক ঋণ নিয়ে নতুন করে ঘর তুলতে হয়। সেই ঋণগুলো এখনও পরিশোধ করতে পারেননি তারা।

    এখন আবার আগুনে সব পুড়ে গেছে। নতুন করে ঘর তুলতে হলে অনেক টাকা প্রয়োজন, যা জোগাড় করা কষ্টসাধ্য। তারা সরকারি সাহায্য কামনা করেন। শনিবার বিকালে ক্ষতিগ্রস্ত কড়াইল বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকের বাতাস এখনও ভারী। পোড়া গন্ধ লেগে আছে প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে। সকালে সূর্যের আলো ফুটতেই স্পষ্ট হয়েছে ধ্বংসের এক বীভৎস চিত্র। সেখানে জীবনের কোনও রঙ নেই, আছে শুধু ছাই আর হাজারো মানুষের বুকফাটা হাহাকার।

    ক’দিন আগেও যেখানে ছিল সারি সারি টিনের ঘর, সেখানে কেবলই পোড়া স্তূপ। বাঁশ, কাঠ আর টিনের ভাঙা টুকরোগুলো একাকার হয়ে আছে মাটির সঙ্গে। বস্তিবাসীরা পুড়ে যাওয়া স্থানেই খোলা আকাশের নিচে রয়েছেন। কেউ ত্রিপল টানিয়ে, কেউ আবার চটের বস্তা কেটে মাথার ওপরে টানিয়েছেন। নিচে পাটি বা চাদর বিছিয়ে পরিবারসহ কোনও রকমে থাকছেন। সঙ্গে বাচ্চারও রয়েছে। বস্তিতে এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়নি। শীতের রাতে অন্ধকারেই মোমবাতি জ্বালিয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। তিব্বত কোম্পানিতে ৯ হাজার টাকা বেতনে ভ্যানচালক হিসেবে কাজ করেন বস্তির বাসিন্দা মোস্তফা।

    তিনি এই বস্তিতে বসবাস করছেন ২০ বছর ধরে। তিনি জানান, বস্তিতে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে পরিবার নিয়ে থাকতেন। অল্প বেতন পেলেও তিল তিল করে গুছিয়েছিলেন থাকার ঘরটি। তিনি বলেন, ‘আগুন সব কেড়ে নিয়েছে। সব পুড়ে যাওয়ায় একেবারেই নিঃস্ব হয়ে গেছি। পরনে যে শার্ট ও লুঙ্গি রয়েছে, এটিই বর্তমান সম্বল। পরিবারের সদস্যদেরও তাই।’ কারও কাছ থেকে কোনও সাহায্য পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্র্যাক থেকে প্রত্যেককে ২ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে।

    তবে তিনি তা পাননি। এছাড়া বিদেশি সংস্থার (ইউনিসেফ) পক্ষ থেকে বিস্কুট, মশারি ও কম্বল দেওয়া হয়েছে। আরেকটি সংস্থার পক্ষ থেকে বাচ্চাদের জন্য দুটি টি-শার্ট ও বড়দের জন্য একটি হুডি (শীতের পোশাক) দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগেও তিনি অর্থ সাহায্য পেয়েছেন এক হাজার টাকা। আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আগুন লাগার পর থেকেই নিয়মিত খাবার দেওয়া হচ্ছে।

    তবে সরকারি কোনও সাহায্য তিনি এখন পর্যন্ত পাননি। তিনি বলেন, ‘আর্থিক সংকট দেখা দেওয়ায় এই কয়েক দিন সাহায্য নিয়ে কোনও রকমে চলছি। যেদিন সাহায্য পাচ্ছি না সেদিন খিচুড়ি রান্না করে খাচ্ছি। গ্যাস নেই, তাই লাকড়ির চুলায় কোনও রকমে রান্না করা হচ্ছে।’ বস্তির আরেক বাসিন্দা আয়নাল জানান, তিনি রিকশা চালান। বস্তিতে তিন হাজার টাকায় একটি রুম নিয়ে ৮ বছর ধরে থাকেন। আগে ঘর ভাড়া কম থাকলেও পরে ধীরে ধীরে বেড়েছে। আগুনে তারও সব পুড়ে গেছে।

    সেই পুড়ে যাওয়া ঘরের এক কোনে ত্রিপল টানিয়ে কোনও রকম পরিবার নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ খাবার দিলে খান, না হলে না খেয়েই থাকতে হচ্ছে। একটি সংস্থার পক্ষ থেকে দেওয়া মশারি ও কম্বল পেয়েছেন। এছাড়া আর কোনও সাহায্য তার ভাগ্যে জোটেনি। বস্তির আদর্শনগর দুই নম্বর ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানেও ক্ষতিগ্রস্তরা ওপরে ত্রিপল বা চাদর টানিয়ে তার নিচে বসে রয়েছেন। সঙ্গে রয়েছে শিশু-কিশোরসহ পরিবারের সদস্যরা। ক্ষতিগ্রস্ত বস্তির বাসিন্দা খাদিজা বেগম জানান, তিনি বাসাবাড়িতে কাজ করেন।

    তার স্বামী আব্দুল মান্নান কলা বেচেন। ৩৫ বছর আগে জমি কিনে ১১টি রুম তোলেন। সেই রুমের তিনটিতে পরিবার নিয়ে থাকতেন। বাকিগুলো ভাড়া দিয়েছিলেন। সেই ভাড়া ও নিজেদের আয় দিয়েই ভালোই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু আগুনে তাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার দুদিন আগে ভূমিকম্পে আমার জায়গার কোনার দিকের একটি অংশ দেবে যায়। সেটি ঠিক করাসহ অন্য ঘরগুলোও মেরামতেও জন্য ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঘরে রাখা ছিল।

    যেদিন আগুন লাগে সেদিনই টাকা ঘরে এনে রাখা হয় পরদিন থেকে ঘরের কাজ করাবো বলে। কিন্তু আগুন লাগলে সকলেই এদিক-ওদিক গিয়ে নিজেদের বাঁচালেও ঘরের কোনও কিছুই রক্ষা করতে পারিনি। অন্যান্য আসবাবপত্রের সঙ্গে পুড়ে গেছে টাকাগুলোও। এসব টাকার অধিকাংশই ঋণ করে সংগ্রহ করা হয়েছিল।’ তিনি বলেন, ‘২০১৭ সালে যখন আগুনে সব পুড়ে গিয়েছিল তখন সব নতুন করে গড়তে প্রায় ১২ লাখ টাকা লেগেছিল। এবার তো আরও বেশি টাকা লাগবে। এত টাকা কই পাবো। সরকারই পারে আমাদের এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে। সরকার যদি সাহায্য দেয়, তাহলে হয়তো আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবো।’

    বস্তির কবরস্থান রোডের ক ব্লকের যে ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়, সেটি মিন্টু মিয়ার বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। আজ সেখানে গিয়ে দেখা গেছে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে জায়গাটি। বিভিন্ন জায়গায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে পুড়ে যাওয়া ঘরের টিনসহ অন্যান্য জিনিসপত্র। পাশেই দেখা মিললো সেই মিন্টু মিয়ার। আগুন লাগার দিন পায়ের নিচের অংশে চোট পেয়েছিলেন। সেখানে ব্যান্ডেজ করা অবস্থায় শুয়ে আছেন একটি ত্রিপলের নিচে। কথা হলে তিনি বলেন, ‘সবই আমার কপাল।

    আমার বাসার রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুন লাগে। তাই পরে ছড়িয়ে পরে বস্তির অন্য ঘরগুলোতে। এখন চাইলেও আমি ঘর তুলতে পারছি না।’ আগুন লাগার পর বস্তির অন্য বাসিন্দারা কিছু বলেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, তারা তো বুঝেন ইচ্ছে করে তো আর আগুন লাগানো হয়নি। এটা একটি দুর্ঘটনা। এতে আমারও সবকিছু পুড়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘৪০ বছর আগে এই বস্তিতে আসি। ১৯টি ঘর ছিল আমার। এছাড়া দুটি দোকান ছিল। একটি খেলনা ও হাঁড়ি-পাতিলের, যেটা আমার। অন্যটি ভাড়া দেওয়া ছিল। আর ঘরগুলোর মধ্যে তিনটিতে আমার পরিবার আর বাকিগুলো ছিল ভাড়া দেওয়া।

    প্রতিটি রুম ৩ হাজার করে ভাড়া ছিল। তবে এই ভাড়ার টাকার কিছু থাকে না। বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খরচ দিয়ে খুবই অল্প পরিমাণ টাকা হাতে থাকতো। দোকান দিয়ে কিছুটা আয় হতো। তা দিয়েই চলতো পরিবারের খরচ। কিন্তু আগুনে দোকানটি পুড়ে ক্ষতি হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার। এখন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবো সেটাই ভেবে পাচ্ছি না।’

    ক্ষতিগ্রস্ত খোকন মিয়া বলেন, তার পুড়ে যাওয়া একখণ্ড জমি রয়েছে। সেখানে ৯টি রুম ছিল তার। যার ৬টি ছিল ভাড়া দেওয়া। আগুনে সবকিছুই পুড়ে গেছে। আবার নতুন করে তুলতে অনেক অর্থের প্রয়োজন, যা তার কাছে বর্তমানে নেই। তিনি বলেন, ‘এর আগে ২০১৭ সালে যখন আগুন লাগে তখনও আমার সব ঘরই পুড়ে গিয়েছিল। তখন বিভিন্ন এনজিও থেকে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা ঋণ নিই। যার মধ্যে এখনও সোয়া লাখ টাকা শোধ হয়নি। এর মধ্যে আবারও সব পুড়লো। এখন টাকা পাবো কোথায়।’ বস্তির সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। কেউ রিকশা চালিয়ে সংসার চালান, কেউ বাসাবাড়িতে কাজ করেন, কেউবা দিনমজুর। এছাড়া আগুনে বাসায় থাকা চাল-ডাল থেকে শুরু করে সবই পুড়ে গেছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো খাদ্যাভাবে ভুগছেন। এ অবস্থায় কিছুটা হলেও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিরা। এছাড়া খাদ্য সহযোগিতা করা হচ্ছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী থেকেও। শনিবার বিকালে পুড়ে যাওয়া বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, একটি মিনি ট্রাকে করে কয়েকটি বড় পাতিল নিয়ে আসা হয়েছে।

    জানতে চাইলে মো. তারেক নামের একজন নিজেকে আমজনতা দলের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে  জানান, তার দলের পক্ষ থেকে আগুন লাগার পরদিন থেকেই খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কী খাবার দিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পাতলা খিচুড়ি। কয়েটি সবজি মিলিয়ে এই খিচুড়ি তৈরি করে বস্তিবাসীদের দেওয়া হচ্ছে। যতদিন সামর্থ্য থাকবে দেওয়া হবে।’ এছাড়া ব্যক্তি উদ্যোগে আরও অনেককে খাবার বিতরণ করতে দেখা গেছে। অসহায় বস্তিবাসীর এখন এই খাবারই একমাত্র বেঁচে থাকার সম্বল।

    সম্পর্কিত সংবাদ

    সর্বশেষ সংবাদ

    ববির ৫ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে র‌্যাগিংয়ের অভিযোগ

    গত চার দিন ধরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যাল ক্যাম্পাসে চাপা অস্বস্তি বিরাজ করছিল সেখানকার শিক্ষার্থীদের জন্য। আজ র‌বিবা‌র (৩০ নভেম্বর) প্রতিষ্ঠানটির...