More

    বরিশালে মিথ্যা জবানবন্দি নিতে রিমান্ডে নিয়ে আসামির চোখ বেঁধে নির্যাতন : অতঃপর

    অবশ্যই পরুন

    নিজস্ব প্রতিবেদক ::: বরিশালে মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়ার জন্য রিমান্ডে নিয়ে কালো কাপড় দিয়ে আসামির চোখ বেঁধে অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে মেট্রোপলিটন কাউনিয়া থানা পুলিশের বিরুদ্ধে।

    এ ঘটনায় গত ২৫ জানুয়ারি সহকারী কমিশনার (কাউনিয়া) পবিত্র, থানার ওসি রফিকুল ইসলাম, তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাওন ও এএসআই উজ্জলকে স্ব-শরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন আমলী আদালতের বিচারক মিরাজুল ইসলাম রাসেল। এরআগে গত ২১ জানুয়ারি আসামির আর্জির ভিত্তিতে নির্যাতনের সত্যতা নিশ্চিতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করালে নির্যাতনের বিষয়টি উঠে আসে।

    জানা গেছে- গত ৬ জানুয়ারি নগরীর কাউনিয়া টেক্সটাইল মোড় এলাকার আকবর নামের এক ব্যক্তির ‘বিসমিল্লাহ স্টীল’ নামের ওয়ার্কশপে একটি পুরাতন স্টিলের আলমারি থেকে সাত রাউন্ড আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি উদ্ধার করা হয়। ওই দিন জাকিরকে ডেকে তার সাথে কয়েক দফা বৈঠক করেন ওয়ার্কশপ মালিক আকবর ও জাহাঙ্গীর আলম নামের সাবেক এক পুলিশ সদস্য। পরদিন তারা সাবেক কাউন্সিলর সাইদুল ইসলাম মামুনের অফিসে বিষয়টি মিমাংসার জন্য যান। সেখানে দুই পক্ষ বাকবিতণ্ডায় জড়ান। এক পর্যায়ে জাহাঙ্গীর আলমকে কয়েকটি চর-থাপ্পড় মারেন জাকিরের ভাই।

    এরপর গত ১২ জানুয়ারি বিকেলে জাকিরকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পরে রাতে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীর আলম বাদী হয়ে গুলি উদ্ধার ও মারধরের ঘটনা উল্লেখ করে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। (যার মামলা নং জিআর-০৬/২৬)। ওই মামলায় আকবরকে এক নম্বর, আকবরের ওয়ার্কশপের কর্মচারি সজিবকে দুই নম্বর, কাউনিয়া থানার কনস্টেবল আবুল বাশারকে তিন নম্বর ও জাহিদ হাসান নামের এক সাংবাদিককে সাক্ষী করা হয়।

    ওই মামলায় জাকিরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাওন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ড আবেদন করলে দুইদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। এরপর ১৯ ও ২০ জানুয়ারি রিমান্ডে নিয়ে মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়ার জন্য কালো কাপড় দিয়ে জাকিরের চোখ বেধে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে সহকারী কমিশনার (কাউনিয়া) পবিত্র ও এএসআই উজ্জল। এতে জাকিরের পায়ের গোড়ালি রক্তাক্ত জখম হয়েছে। আদালতের বিচারকের কাছে এমনটাই আর্জি জানিয়েছেন জাকির। গত ২১ জানুয়ারি জাকিরের আর্জি আমলে নিয়ে নির্যাতনের সত্যতা নিশ্চিতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করানো হয়।

    পরীক্ষা-নিরিক্ষায় জাকিরের পায়ের গোড়ালিতে আঘাতের বিষয়টি প্রতিয়মান হয়। এরপর ২৫ জানুয়ারি জারিকৃত একটি আদেশে আগামী ২৯ জানুয়ারি সহকারী কমিশনার (কাউনিয়া) পবিত্র, থানার ওসি রফিকুল ইসলাম, তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাওন ও এএসআই উজ্জলকে স্ব-শরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন আমলী আদালতের বিচারক মিরাজুল ইসলাম রাসেল।

    তবে মামলার সাক্ষীদের সাথে কথা বলে জানা যায়- আকবর ছাড়া কেউ জানেনা তারা গুলি উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলার সাক্ষী। আর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই শাওনও জানেন না এই মামলার আদ্যপান্ত ঘটনা।

    এসআই শাওন বলেন- গুলি উদ্ধার আমি করিনি, অন্য এক অফিসার করেছে। মামলা হওয়ার পর আমাকে তদন্তভার দেওয়া হয়েছে। এরআগেই আসামী আটক করে আদালতে পাঠানো হয়েছিল। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে রিমান্ডে আনা হয়েছিল। কিন্তু আমি থানায় থাকাকালিন তাকে নির্যাতন করা হয়নি। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা।

    ৬ জানুয়ারি গুলি উদ্ধার হলেও ১২ জানুয়ারি মামলা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন- ভাই (প্রতিবেদক) এ বিষয়ে আমি কিছু জানিনা। আমার উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন।

    এ বিষয়ে মামলার এক নম্বর সাক্ষী আকবর শেখ বলেন, গত ২৫ ডিসেম্বর জাকির হোসেন আমার দোকানে স্টিলের আলমারি মেরামত করতে দেয়। একপর্যায়ে ৬ জানুয়ারি আলমারি মেরামতের সময় ভিতরে ছোট্ট পকেটে সাত রাউন্ড গুলি পাই। সেই সময় আমার দোকানে সাবেক পুলিশ সদস্য জাহাঙ্গীর আলম উপস্থিত থাকায় আমি বুলেটগুলো তাকে দেখাই। আমি গুলি চিনতাম না। এ সময় জাহাঙ্গীর পুলিশ জাকির হোসেনকে ফোন দিতে বলেন। আমি ফোন দিলে জাকির হোসেন এসে জাহাঙ্গীরের সাথে কথা বলেন। এক পর্যায়ে দুজনে বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয়ে জাকির হোসেন বুলেটগুলো বিসিকের ভিতরে ফেলে দিয়ে অটোরিক্সায় উঠে চলে যায়।

    পরে আমি ও জাহাঙ্গীর পুলিশ বুলেটগুলো উদ্ধার করে কাউনিয়া থানায় গেলে ওসি সাহেব থানায় না থাকায় আমরা চলে আসি। পরে সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীর পুলিশ একা গিয়ে বুলেটগুলো থানায় জমা দিয়ে আসেন। এরপর হঠাৎ শুনি গত ১২ জানুয়রি জাহাঙ্গীর পুলিশ বাদি হয়ে জাকির হোসেনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছে।

    মামলার ২ নম্বর সাক্ষী ওয়ার্কশপের কর্মচারি সজিব বলেন- গুলি উদ্ধারের সময় আমি পাশের দোকানে ছিলাম। এসে শুনি আকবর কাকা জাকির হোসেনের আলমারিতে গুলি পেয়েছে। আমি এসে দেখি জাহাঙ্গীর পুলিশ ও আকবর কাকা একসাথেই গুলি নিয়ে আলাপ করছিল। তবে আলমারির কোন জায়গা থেকে গুলিগুলো উদ্ধার হয়েছে তা দেখিনি।

    তিনি আরও বলেন- আমি যে ওই মামলার ২ নম্বর সাক্ষী তা আগে জানতাম না। আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। এরমধ্যে একদিন কাউনিয়া থানার এসি স্যার এসে আমার নাম-ঠিকানা নিয়েছিল, তবে কি কারণে নিয়েছে তা বলেনি। এখন বুঝলাম আমাকে সাক্ষী করার জন্যই নাম-ঠিকানা নিয়েছে।

    মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী কাউনিয়া থানার কনস্টেবল আবুল বাশার বলেন- গুলি উদ্ধারের বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। আমি যে ওই মামলার সাক্ষী তাও জানতাম না। তবে ওসি স্যার এসে থানায় পুলিশের অস্ত্র এসেছে সেজন্য স্বাক্ষর লাগবে এই কথা বলে স্বাক্ষর নিয়েছে। গুলি উদ্ধারের মামলায় আমি সাক্ষী আমারে কিছুই জানানো হলো না। বিষয়টি বুঝলাম না।

    মামলার আরেক সাক্ষী সাংবাদিক জাহিদ হাসান বলেন- আমি গুলি উদ্ধারের বিষয়ে কিছুই জানিনা। তবে মারধরের দিন উপস্থিত ছিলাম। আমাকে সাক্ষী করতে নিষেধ করেছিলাম, তবুও আমাকে সাক্ষী রেখেছে।

    এ বিষয়ে মামলার বাদী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মামলার বিষয়ে এখন কছিু বলতে পারবো না। পরে বলবো বলে কলটি কেটে দেন।

    এএসআই উজ্জল বলেন- আমি গুলি উদ্ধারের বিষয়ে কিছুই জানিনা। রিমান্ডে কোন আসামী মারধর করার ইখতিয়ার আমার নেই। আমি তাকে মারধর করিনি।

    এ বিষয়ে কাউনিয়া থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন- আদালতের কোন আদেশ এখনো হাতে পাইনি। আর ওই মামলার আসামির আর্জিতে আমার কথা বলা হয়নি। আদালত তলব করলে অবশ্যই যাবো। কিন্তু কাগজ হাতে না পেয়ে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না।

    সহকারী কমিশনার (কাউনিয়া) পবিত্র পুরো ঘটনাটি অস্বীকার করে বলেন- আমি কাউকে মারধর করিনি। আর ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। আদালতের কোন আদেশ পাইনি।

    এ বিষয়ে জাকিরের ছোট ভাই জাহিদ বলেন- আমার ভাই ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, নিয়মিত রোজা রাখেন। তিনি গুলি রাখার মতো লোকই না। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন। আর যদি কেউ আলমারি মেরামত করতে দেয় গুলি কেন একটা সুতাওতো আলমারির সাথে দেবে না। আমার ভাইকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। কারণ ৬ জানুয়ারির পর থেকে একটি নম্বর দিয়ে কল করে কাউনিয়া থানার সেকেন্ড অফিসারের পরিচয় দিয়ে ৫ লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টি মিমাংসার জন্য একাধিক বার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা রাজি না হওয়ায় মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়ার জন্য রিমান্ডে নিয়ে কালো কাপড় দিয়ে আমার ভাইয়ের চোখ বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে পুলিশ। যা মেডিকেল রিপোর্টে স্পষ্ট হয়েছে।

    এদিকে পুরো বিষয়টি বিচারক বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উন্মোচনের দাবি জানিয়েছে জাকির হোসেনের পরিবার।

    সম্পর্কিত সংবাদ

    সর্বশেষ সংবাদ

    তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামীর বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ দেশে পরিণত হবে- মেজর হাফিজ

    ইউসুফ আহমেদ,ভোলা প্রতিনিধি : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোলা-৩ আসন (লালমোহন তজুমদ্দিন) ধানের শীষ...