কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি : বাংলাদেশের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বিদ্যুৎ খাতে বৈপ্লবিক রূপান্তরের লক্ষ্যে রুফটপ সোলার (ছাদ সৌরবিদ্যুৎ) প্রযুক্তিকে দ্রুত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ ও কমিউনিটি প্রতিনিধিরা।

রোববার পটুয়াখালীর কলাপাড়াতে প্রান্তজন ট্রাস্ট , প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম পটুয়াখালী (ফেড – পটুয়াখালী), ক্লিন, বিডাব্লিউজিইডি এবং স্থানীয় কমিউনিটি প্ল্যাটফর্মসমূহের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল মোবিলাইজেশন কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্রিয় সমর্থন ও সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। সমাবেশে স্থানীয় সাংবাদিক, যুব প্রতিনিধি এবং পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা অংশ নিয়ে জ্বালানি খাতের এই পরিবর্তনের পক্ষে সংহতি প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে একটি প্রতিনিধি দল কলাপাড়া পৌরসভার প্রশাসক কাউছার হামিদের কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দেয়।
এই কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম – পটুয়াখালীর আহ্বায়ক অমল মুখার্জী; সদস্য মেজবাহউদ্দিন মাননু, নুরুল হক, প্রান্তজন এর ফিল্ড কোর্ডিনেটর সাইফুল্লাহ মাহমুদ এবং সঞ্চালনা করেন ফেড- পটুয়াখালীর সদস্য সচিব মোঃ নজরুল ইসলাম। এই সময়ে উপস্থিত ছিলেন কলাপাড়া প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, ফেড – পটুয়াখালী এর সদস্য উত্তম হাওলাদার, মোঃ সাইদুর রহমান এবং মোঃ নাহিদুল হক, নাজমুস সাকিব সহ প্রমুখ।
মূল বক্তব্যে প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরামের (FED) নেতৃবৃন্দ বলেন, দেশের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যয়বহুল ও আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমানে দেশের অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে রুফটপ সোলার একটি পরিচ্ছন্ন, সহজলভ্য এবং অত্যন্ত কম ব্যয়বহুল সমাধান হওয়া সত্ত্বেও এটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথ অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। বক্তারা বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন যে, রুফটপ সোলার কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জন্য ‘জ্বালানি গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার সুযোগ। ইউনিয়ন পরিষদ ভবন থেকে শুরু করে স্কুল, হাসপাতাল এবং গ্রামীণ বাজারগুলোর বিশাল অব্যবহৃত ছাদ যদি সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা যায়, তবে স্থানীয় পর্যায় থেকেই একটি বৃহৎ জ্বালানি বিপ্লব শুরু করা সম্ভব।
প্রান্তজন এর ফিল্ড কোর্ডিনেটর, সাইফুল্লাহ মাহমুদ বলেন, বিগত ১৬ বছরে শুধুমাত্র বেসরকারি জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের ১ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ প্রদান করা হয়েছে। যা দিয়ে ৩টা পদ্মা সেতু করা সম্ভব ছিল। তাই আমাদের জ্বালানী নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য জ্বালানী বিশেষ করে সোলারের উপর জোর দিতে হবে।
বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ছাদ কোনো কাজে আসছে না। সেখানে পরিকল্পিতভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করলে একদিকে যেমন জাতীয় গ্রিডের ওপর লোড-শেডিংয়ের চাপ কমবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতা হ্রাসের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। এই রূপান্তর কেবল পরিবেশই রক্ষা করবে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ টেকনিশিয়ান ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের বিশাল বাজার সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে নারী ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা একটি সাশ্রয়ী ও ন্যায্য জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
কর্মসূচি শেষে অংশগ্রহণকারীরা স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের নিকট ৫-দফা জোরালো দাবি পেশ করেন। দাবিসমূহ হলো—স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে (ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি কর্পোরেশন) রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে সুনির্দিষ্ট নীতিগত ও আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে; প্রতিটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত ভবনের ছাদে বাধ্যতামূলকভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে;
সাধারণ মানুষের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি ভর্তুকি এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার গ্যারান্টি দিতে হবে; জ্বালানি রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে; এবং পরিবেশ ধ্বংসকারী জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে বাস্তবায়নযোগ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ গ্রহণ করতে হবে। বক্তারা সতর্ক করে বলেন, স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত না করে কেবল কেন্দ্র থেকে নেওয়া পরিকল্পনা টেকসই হবে না। বাংলাদেশ যদি এখনই রুফটপ সোলারকে অবহেলা করে, তবে দেশ পুনরায় ব্যয়বহুল ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক জ্বালানি সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত হবে।
