স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত লটারি পদ্ধতি বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী বছর (২০২৭ শিক্ষাবর্ষ) থেকে সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষার ভিত্তিতে শিক্ষার্থী নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
গতকাল সোমবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। তবে সরকারের এ সিদ্ধান্তে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। তারা বলছেন, এ প্রক্রিয়া শুরু হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি নিয়ে ফের বাণিজ্য ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা পদ্ধতিতেও অনিয়ম ঠেকানোর সুযোগ কম। এ ছাড়া সারাদেশের ২০ হাজার স্কুল-কলেজে ভর্তি পরীক্ষা নজরদারি করার মতো জনবলও সরকারের নেই। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশে প্রথম শ্রেণিতে স্কুলে ভর্তি হতে কোনো পরীক্ষা শিশুদের দিতে হয় না।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘ভর্তি পরীক্ষা খুব জটিল কোনো পরীক্ষা হবে না। ক্লাস ওয়ানে তো আর আমরা তাদের নিউরোসার্জন বানাতে যাচ্ছি না। খুব সাধারণ একটি পরীক্ষার মাধ্যমেই ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।’
ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে কোচিং বাণিজ্য বা তদবির বাড়তে পারে– এমন আশঙ্কার বিষয় উড়িয়ে দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এখানে কোচিং বাণিজ্যের কোনো সুযোগ থাকবে না। পরীক্ষাটি হবে খুবই সাধারণ। অভিভাবকদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমার মতে, লটারির মাধ্যমে ভর্তি কোনো শিক্ষা ব্যবস্থায় থাকা উচিত নয়।’
এক সময় দেশের স্কুলগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা ছিল প্রচলিত নিয়ম। তখন শিশুদের অল্প বয়সেই কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হতো। কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর নির্ভরতা বেড়ে গিয়েছিল এবং ভর্তি ঘিরে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও ছিল।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষা একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। যে ধরনের পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাতে যারা কোচিং বা প্রাইভেট পড়ে তারাই মূলত এগিয়ে থাকে। অর্থনৈতিক সংকটগ্রস্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া উচিত নয়। ভর্তি পরীক্ষা মানেই হলো কোচিং বাণিজ্য চলে আসবে। পরীক্ষায় ফেল করা মানেই শিশুকে ট্যাগ দেওয়া ‘সে পারে না’। এভাবে শিশুকে ট্রমার মধ্যে দেওয়া উচিত নয়।
প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা ঐচ্ছিক
সংবাদ সম্মেলনে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার বিষয়েও কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি জানান, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক নয়। এটা আবশ্যিক নয়, ঐচ্ছিক। যে শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে চায় সে দেবে, না চাইলে দেবে না। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বছর পঞ্চম শ্রেণি শেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার চার মাস পর শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে। আইনি জটিলতার কারণে ২০২৫ সালে এ পরীক্ষা আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। নতুন করে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সব ঠিক থাকলে আগামী এপ্রিলে পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হতে পারে।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির যোগ্যতা স্নাতক বহাল
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডির সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত জানানো হয়। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এ পদে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি বহাল থাকবে। দেশের সব স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। শিক্ষক নিয়োগে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে একটি কার্যকর কাঠামো তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
