দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কমপক্ষে সাত জেলায় রোগটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু চলতি মাসেই হামে ২১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ না দেওয়ায় পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।
শিশুদের হামের টিকা দেওয়ায় ঘাটতি আছে। হাম খুবই সংক্রামক, অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত হলে তার থেকে ১৫–১৮ জন সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই রোগ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে, শিশুমৃত্যু বাড়তে পারে।
শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান বলেন, ‘সারা দেশেই কমবেশি হাম আছে। তবে আমরা ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে বেশি রোগী দেখতে পাচ্ছি।’ তবে সরকারের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভোলা ও পটুয়াখালীর রোগীরা রাজধানীর এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিচ্ছে। প্রথম আলোর প্রতিনিধি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেও রোগী আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য মারাত্মক উদ্বেগজনক। সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার নিজাম উদ্দিন আহমেদ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোয় যোগাযোগ করে জানা গেছে, ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩টি, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ৩টি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য মারাত্মক উদ্বেগজনক। সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ অবস্থায় দ্রুত টিকাদান, শক্তিশালী নজরদারি, সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সরেজমিনে হাসপাতাল গতকাল দুপুরে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর ভিড় ও লম্বা লাইন।
অনেকের কোলে শিশু। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কেউ এসেছেন হাম কি না, তা নিশ্চিত হতে; কেউ এসেছেন বসন্ত কি না, তা জানতে। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে হাম, বসন্ত, এইচআইভি/এইডস, ধনুষ্টংকার, কালাজ্বর ও জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসা হয়। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় হামের রোগীর জন্য শয্যা আছে আটটি; কিন্তু গতকাল দুপুর পর্যন্ত শুধু হাম ও হাম সন্দেহে রোগী ভর্তি ছিল ১১৭ জন।
বিভিন্ন তলায় বারান্দা ও মেঝেতে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে মায়েদের শুয়ে থাকতে দেখা যায়। নরসিংদীর বাগহাটা গ্রাম থেকে আসা মুন্নি আখতারকে দেখা যায়, চারতলার বারান্দায় তাঁর এক বছরের ছেলে আহমদুল্লার জন্য জায়গা করে নিয়েছেন। মুন্নি আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ১৫ দিন আগে ছেলের জ্বর হয়, পরে গায়ে র্যাশ ওঠে। স্থানীয় একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ছেলেকে দেখান। তারপর ওই ক্লিনিক থেকে জানায় ছেলের হাম, এই হাসপাতালে আনতে পরামর্শ দেয়। রাজধানীর বছিলা এলাকা থেকে আসা এক নারী বলেন, এক বছরের ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় থাকতে সমস্যা হচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও কোনো ওয়ার্ডে শয্যা পাননি।
হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় হামের রোগীর জন্য শয্যা আছে আটটি; কিন্তু গতকাল দুপুর পর্যন্ত শুধু হাম ও হাম সন্দেহে রোগী ভর্তি ছিল ১১৭ জন। বিভিন্ন তলায় বারান্দা ও মেঝেতে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে মায়েদের শুয়ে থাকতে দেখা যায়। হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (শিশু স্বাস্থ্য) এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ৪৫০ জন রোগী হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। গতকাল যে ১১৭ জন ভর্তি ছিল, তাদেরও ৭০ ভাগ হামের রোগী। চলতি মার্চে তিনটি শিশু মারা গেছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আজিমপুর থেকে বেশি রোগী আসছে। তিনি আরও বলেন, হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর টিকা নেওয়া নেই। উল্লেখ্য, গত বছর এই হাসপাতালে হামের রোগী সন্দেহে ৬৯ জন ভর্তি হয়েছিলেন। তার মধ্যে ২৩ জনের হাম শনাক্ত হয়। হামের রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা জাহান প্রথম আলোকে বলেন, কোনো রোগী না থাকায় কালাজ্বরের ওয়ার্ডে হামের রোগী রাখা হচ্ছে। এইডসের কিছু রোগীকে ছুটি দেওয়া হয়েছে।
বাকি অংশ হামের রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে নতুন সমস্যাও দেখা দিয়েছে বলে তত্ত্বাবধায়ক জানান। তিনি বলেন, এখন বসন্ত রোগের মৌসুম। গতকাল ১০ জন বসন্তের রোগী ভর্তি ছিল। বসন্তের রোগী বাড়লে তাঁদের সমস্যায় পড়তে হবে। বসন্ত রোগও সংক্রামক। এই হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসক আছেন ২২ জন। হামের রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার ছয়জন বাড়তি চিকিৎসক এই হাসপাতালে পাঠিয়েছে।
হামের রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা জাহান প্বলেন, কোনো রোগী না থাকায় কালাজ্বরের ওয়ার্ডে হামের রোগী রাখা হচ্ছে। এইডসের কিছু রোগীকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশ হামের রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
