More

    দেবে যাচ্ছে বরিশাল নগরী

    অবশ্যই পরুন

    প্রতিবছর প্রায় পৌনে ২ মিলিমিটার নিচে নেমে যাচ্ছে বরিশাল নগরী। কখনো কখনো এই দেবে যাওয়ার পরিমাণ এক ইঞ্চি পর্যন্ত। ক্রমেই মাটি দেবে যাওয়ার ফলে হেলে পড়ছে ভবন। যদিও বিষয়গুলো ধরা পড়ছে না খালি চোখে। এই পতন অব্যাহত থাকলে ভয়াবহ হতে পারে পরিস্থিতি। ভবন স্থাপনা ঝুঁকির মুখে পড়ার পাশাপাশি কাছাকাছি চলে আসতে পারে সমুদ্রপৃষ্ঠ আর ভূমি উপরিভাগের সমতল। সেক্ষেত্রে সামান্য উঁচু জোয়ারেও দেখা দেবে ভয়াবহ প্লাবন। তলিয়ে যাবে এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ। যদিও সেই বিপদের মুখে পড়তে সময় লাগবে বহু বছর। তবে এখন থেকেই তা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। নয়তো ৫০ কিংবা ১শ’ বছর পর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়তে পারে প্রাচ্যের ভেনিসখ্যাত ধান নদী খালের বরিশাল।

    বরিশাল নগরী ও সংলগ্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত টানা ৬ বছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে ভয়াবহ এই তথ্য। উন্নয়ন সহযোগী দেশ জার্মানির সহায়তায় বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ও ফেডারেল ইনস্টিটিউট ফর জিওসাইন্স অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষণার প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয় গভীর তলদেশ সংগ্রহ করা ভূ-গর্ভস্থ উপাদান পরীক্ষা, স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ এবং ভূ-উপরিভাগে থাকা স্থাপনা পর্যবেক্ষণ। যদিও এই গবেষণার ফলাফল সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করেনি ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর। তবে বিষয়টি জানানো হয়েছে বরিশাল সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন নগর এলাকায় জার্মান উন্নয়ন সংস্থার সম্ভাব্য অনুদান কিংবা উন্নয়ন সহযোগিতা প্রদান প্রশ্নে আগাম প্রস্তুতি হিসাবে করা হয় এই গবেষণা। নগর এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে এই গবেষণা সহায়ক হবে ভেবেই কাজটি করে জার্মান উন্নয়ন ব্যাংক। পুরো প্রকল্পটিতে অর্থ সহায়তা দেয় জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন ‘জাইকা’।

    গবেষণার আওতায় ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৬ বছরের ভূ-প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহের পর পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে দেখা যায়, বরিশাল নগরী ও সংলগ্ন এলাকায় প্রতিবছরই নিচে নামছে মাটির স্তর। দেবে যাওয়ার পরিমাণ গড়ে ১ দশমিক ৬৬ মিলিমিটার হলেও বছরভেদে এটি কমছে ও বাড়ছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পতনের রেকর্ড পাওয়া যায় এক বছরে ২৪ দশমিক ১৭ মিলিমিটার। যা প্রায় ১ ইঞ্চি। এর বাইরে ভূমি গঠনেরও কিছু প্রমাণ মিলেছে। বছরে যার গড় পরিমাণ ৫ দশমিক ৬৩ মিলিমিটার। তবে তা এই ভূমি গঠন প্রাকৃতিক কারণে নয়। নিজেদের প্রয়োজনে নিচু এলাকা ভরাট করে প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করছে মানুষ। ফলে এই ভূমি গঠনে আশা করার মতো কিছু নেই বলে জানান গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ভূমির এই পতনে বরিশাল নগরীতে থাকা বিভিন্ন স্থাপনায় বিচ্যুতিরও প্রমাণ মেলে গবেষণায়।

    পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে স্যাটেলাইট ইমেজে। আমরা দেখতে পাই বরিশাল নগরীর বৌদ্ধপাড়া বিএম কলেজ এলাকার কয়েকটি ভবনে ভার্টিক্যাল বিচ্যুতি। সোজা বাংলায় যাকে বলে হেলে পড়া। স্যাটেলাইট ইমেজ ধরে ওই এলাকায় গিয়ে এর প্রমাণও মেলে। আমরা দেখতে পাই, নতুন তৈরি করা একটি বহুতল ভবন সামনের দিকে কয়েক মিলিমিটার হেলে পড়েছে। পরে গবেষণার মাধ্যমে নিশ্চত হই ভূ-গর্ভস্থ মাটির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ঘটেছে ভবন হেলে পড়ার ঘটনা। বরিশাল নগরীর আরও কয়েকটি এলাকা যেমন বটতলা, করিম কুটিরেও আমরা এভাবে ভবন হেলে পড়ার প্রমাণ পেয়েছি।’

    মাটির স্তর নিচে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রধানত দুটি কারণে ঘটছে এটা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির বেপরোয়া উত্তোলন। উঁচু উঁচু ইমারত নির্মাণে মাটির ওপর চাপ বাড়ছে এটা যেমন ঠিক, তেমনি যুগ যুগ ধরে মাটির নিচ থেকে পানি উঠানোর ফলে নষ্ট হচ্ছে অভ্যন্তরভাগে থাকা পানির স্তরের স্থিতিস্থাপকতা। বেপরোয়া পানি উত্তোলনের ফলে শূন্যতা সৃষ্টি হচ্ছে মাটির নিচে থাকা পানির স্তরে। উপরের মাটি বসে গিয়ে পূরণ করছে ওই শূন্যতা। ফলে নিচে নেমে যাচ্ছে পুরো নগরী এবং সংলগ্ন এলাকা।’ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর কর্মকর্তার দেওয়া এই বক্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় বরিশালের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া সংক্রান্ত তথ্যের।

    জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইমরান বলেন, ‘একটা সময়ে এখানে মাটির ৭শ’-৮শ’ ফিট গভীরে গেলেই মিলত নিরাপদ সুপেয় পানি। সাধারণ মানুষ যেটাকে চেনে গভীর নলকূপের স্তর হিসাবে। বর্তমানে তা পেতে স্থান ভেদে ১ হাজার থেকে ১১শ’ ফিট পর্যন্ত গভীরে নিতে হচ্ছে টিউবওয়েলের পাইপ।’

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘কৃষিসংক্রান্ত কাজে নিয়মিত ভূ-অভ্যন্তর ভাগের পানির স্তর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করি আমরা। কেবল নগরী নয়, পুরো জেলায়ই এটা করতে হয় আমাদের। বর্ষাকালে উপরিভাগের ৫-৭ ফিট নিচে গেলেই মেলে পানির স্তর। তবে সমস্যা হয় গ্রীষ্মে। তখন ৩০-৪০ ফিট নিচে গিয়েও পাওয়া যায় না পানির স্তর। এটিও আবার নামছে ফি বছর। ৮-১০ বছর আগেও গ্রীষ্ম মৌসুমে ১৫-২০ ফিট নিচে পানির স্তরের অস্তিত্ব পেতাম। কিন্তু এখন তা নেমে গেছে ৩০-৪০ ফিটে। দিন দিন বাড়ছে পানির স্তরের এই নিচে নেমে যাওয়ার পরিমাণ।’ বরিশাল নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মাত্র কিছু বছর আগেও বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলে সব মৌসুমেই সহজে পাওয়া যেত টিউবওয়েলের পানি। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে চৈত্র-বৈশাখে দেখা যাচ্ছে পানির হাহাকার। পানি ওঠে না ডিপ টিউবওয়েলে। বরিশাল নগরীসংলগ্ন রায়পাশা কড়াপুর, বাবুগঞ্জ উপজেলার পাংশাসহ বহু এলাকায় দেখা দিচ্ছে এই সংকট। গ্রীষ্ম এলেই ওইসব এলাকার মানুষ আর পানি পায় না চাপকলে। যতদূর জানি সমস্যা সমাধানে বিকল্প খুঁজছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।’

    মানবাধিকার কর্মী ও পরিবেশ ফেলো মুরাদ আহম্মেদ বলেন, ‘গবেষণায় মাটি দেবে যাওয়ার যে গড় পরিমাণ বলা হয়েছে, তা আপাতদৃষ্টিতে কম মনে হলেও সময়ের হিসাবে এটা ভয়ংকর। এই পরিমাণটিকে ৫০-১০০ দিয়ে গুণ করলেই বোঝা যায় ৫০-১০০ বছর পর কী হবে। এভাবে পতন অব্যাহত থাকলে একসময় সমুদ্রপৃষ্ঠ আর নগরীর ভূ-উপরিতল চলে আসবে সমান পর্যায়ে। তখন দেখা যাবে যে, সামান্য উঁচু জোয়ারেও তলিয়ে যাচ্ছে বরিশাল। জলোচ্ছ্বাস কিংবা প্লাবন হলে তো টিকবে না কিছুই। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী কী করা উচিত তা এখন থেকেই ভাবতে হবে। উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। নয়তো একসময় পানির নিচে তলিয়ে যাবে পুরো এলাকা।’

    পুরো বিষয়টি নিয়ে আলাপকালে গবেষণা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকা ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান বলেন, ‘প্রকৃতির আচরণ কখন কীরকম হয় বলা মুশকিল। এখন যেখানে মাটির স্তর নিচে নামছে, এটা বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তবে আমরা গবেষণায় যা পেয়েছি তাতে এটা কেবলই নামছে। এই প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে যায়। তাই এখন থেকেই এটা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি মনে করি, ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার বন্ধ করে সারফেস বা ভূ-উপরিভাগ যেমন পুকুর, নদী, খালের পানি ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত করতে হবে। এই পানি পরিশোধন করে চাহিদার সবটুকু যাতে সরবরাহ করা যায় তার ব্যবস্থা নিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। সেইসঙ্গে ঠেকাতে হবে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। তাহলেই হয়তো এই বিপদ থেকে বাঁচতে পারব আমরা।’

    সম্পর্কিত সংবাদ

    সর্বশেষ সংবাদ

    বানারীপাড়ায় ৫২ পিস ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

    রাহাদ সুমন ,বিশেষ প্রতিনিধি:  বরিশালের বানারীপাড়ায় ডিবি ও থানা পুলিশের মাদকবিরোধী পৃথক বিশেষ অভিযানে কাওছার ও মেহেদী হাসান হীরা...