দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল ২০২৫ সাল। বছরজুড়ে অজস্র প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, ঘটন-অঘটন, আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক আর নানান ইস্যুতে ব্যস্ত ছিল দেশের ক্রিকেটাঙ্গন। মাঠের ক্রিকেটে কখনও হেসেছেন, কখনও হতাশায় ডুবেছেন ক্রিকেটাররা। তবে ২০২৫ সালটি বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য মাঠের অর্জনের চেয়ে মাঠের বাইরের অস্থিরতার কারণেই বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশের পুরুষ, নারী এবং বয়সভিত্তিক দলগুলো তিন ফরম্যাটেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে তাদের এই হতাশাজনক পারফরম্যান্স ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) অভ্যন্তরে চলমান প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা। মাঠের বাইশ গজের বাইরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত রেখেছেন ফারুক আহমেদ, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, তামিম ইকবাল কিংবা জাহানারা আলমরা।
সব কিছু মিলিয়ে ২০২৫ সালে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রেই ছিল ক্রিকেট। নতুন বছর শুরুর আগে একনজরে দেখে নেওয়া যাক বিগত বছরে ক্রিকেটের আলোচিত সব কিছু।
বিপিএলে ফিক্সিং কেলেঙ্কারি
বছরের প্রথম বড় ধাক্কা আসে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) ১১তম আসরে। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগটি কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বোর্ডের অ্যান্টি-করাপশন ইউনিটের সতর্কতার পর খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও ফ্র্যাঞ্চাইজিদের নাম ছড়াতে থাকে। দীর্ঘ নয় মাস তদন্ত করে বিসিবি একটি বিশাল প্রতিবেদন তৈরি করলেও সেটি প্রকাশ করা হয়নি।
পরে আইসিসির সাবেক দুর্নীতি দমন প্রধান অ্যালেক্স মার্শালকে এনে এসিইউ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। তার সুপারিশে কয়েকজনকে ভবিষ্যৎ বিপিএল থেকে বাদ দেওয়া হয়। এদিকে ‘দুর্বার রাজশাহী’ ও ‘চট্টগ্রাম কিংস’-এর বকেয়া পাওনা নিয়ে জটিলতা বিপিএলের বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও নড়বড়ে করে তোলে। শেষ পর্যন্ত নতুন করে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে চুক্তি করে বিসিবি।
ক্ষমতার পালাবদলের নাটক
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সব সেক্টরের মতো বিসিবিতেও সংস্কারের হাওয়া লাগে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পলাতক নাজমুল হাসান পাপনের জায়গায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) মনোনীত পরিচালক হয়ে বোর্ড সভাপতির দায়িত্ব নেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ।
কিন্তু বছর না যেতেই বিসিবি সভাপতির পদ হারান ফারুক আহমেদ। বিপিএলে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে মে মাসে ৮ বোর্ড পরিচালক ফারুক আহমেদের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ করেন। এরপর এনএসসি তার পরিচালকের পদ বাতিল করলে বিসিবি সভাপতির পদও চলে যায়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নেন আরেক সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুল।
বিসিবির বিতর্কিত নির্বাচন
বিসিবিতে অন্তর্বতী সময়ে সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেছিলেন, ‘আমি টি-টোয়েন্টি খেলতে এসেছি।’ তবে টি-টোয়েন্টি খেলতে এসে এখন টেস্টে নেমেছেন বুলবুল। অন্তবর্তী দায়িত্ব শেষে ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়া সর্বশেষ বিসিবি নির্বাচনে তিনি পূর্ণ মেয়াদে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান। তবে এ নির্বাচন ছিল বেশ বিতর্কিত।
নির্বাচনের আগে তৃতীয় বিভাগ বাছাইপর্ব পেরিয়ে আসা ১৫ ক্লাবের কাউন্সিলরশিপ বাতিল করে বিসিবির নির্বাচন কমিশন। ফলে সেই ক্লাবগুলো নির্বাচন বর্জন করে। এ ঘটনার জেরে বিসিবি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তামিম ইকবালসহ ১৬ প্রার্থী। অবশেষে নির্বাচন হলে সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় সভাপতি নির্বাচিত হন বুলবুল।
মজার ব্যাপার, যেই ফারুকের বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তিনি এই নির্বাচনে ক্লাব কোটায় পরিচালক হয়েছেন। এর পর তাকে সহ-সভাপতিও করা হয়। এ ছাড়াও জয়লাভ করেন আরও দুই সাবেক ক্রিকেটার খালেদ মাসুদ পাইলট ও আব্দুর রাজ্জাক। এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন ক্রিকেট প্রশাসনকে করে তোলে অস্থির।
ঘরোয়া ক্রিকেট অচল, ক্রিকেটাররা অনিশ্চয়তায়
বুলবুলের অধীনে নতুন বোর্ডে প্রথম বড় ধাক্কা আসে ঘরোয়া ক্রিকেটে। গত ২৫ নভেম্বর থেকে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট মাঠে গড়ানোর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত হয়নি। মূলত বিসিবি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ৪৩ ক্লাব এই লিগ বয়কটের ঘোষণা দিয়েছিল। সেটি এখনও সমাধান হয়নি, ফলে শঙ্কা রয়ে গেছে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট শুরু হওয়া নিয়ে। বিসিবি এরই মধ্যে একাধিকবার ক্লাবগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছে এবং বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছে।
তবে কিছুতেই যেন ক্লাবগুলোর অভিমানের বরফ গলাতে পারছে না বিসিবি। সর্বশেষ ২৫ নভেম্বর ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগের ক্লাবসমূহকে চা-চক্রের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বিসিবি। বিসিবির পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ ক্রিকেটের সার্বিক উন্নয়ন, খেলোয়াড়দের কল্যাণ সংক্রান্ত বিষয় এবং পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি ঢাকার ক্লাবসমূহের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে বোর্ড একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক ও চা-চক্রের আয়োজন করেছে। তবে বিসিবির সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি ক্লাবগুলো।
নারী ক্রিকেটে বিস্ফোরক অভিযোগ
বছরের শেষ ভাগে এসে যৌন হয়রানির ভয়াবহ ও বিস্ফোরক অভিযোগ করেন জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও তারকা পেসার জাহানারা আলম। বোর্ডের নারী ক্রিকেট বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা প্রয়াত তৌহিদ মাহমুদ ও নারী দলের সাবেক নির্বাচক-ম্যানেজার ও জাতীয় দলের সাবেক পেসার মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জুর বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ আনেন জাহানারা। এছাড়া নারী দলের বর্তমান অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতির বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও করেন তিনি।
জাহানারার দেখাদেখি জাতীয় দলের আরও কয়েকজন ক্রিকেটারও যৌন হয়রানিসহ আরও কিছু অভিযোগ করেন। যা নিয়ে তোলপাড় পড়ে যায় দেশের ক্রিকেটে। আপাতত এটি নিয়ে তদন্ত করছে বিসিবি। কয়েক দফা তদন্তের মেয়াদ বাড়িয়ে নতুন বছরের শুরুর দিকে হয়তো পাওয়া যেতে পারে চূড়ান্ত প্রতিবেদন। এই কলঙ্ক নারী ক্রিকেটের নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
বিপিএলে বিপর্যয় ও দুর্নীতির ছায়া!
অনেকটা তাড়াহুড়োর মধ্যে ২০২৫ সালের বিপিএল আয়োজন করে সুনামের বদলে দুর্নামই কুড়িয়েছিল বিসিবি। ম্যাচ ও স্পট ফিক্সিংয়ের গুরুতর অভিযোগ, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর পারিশ্রমিক পরিশোধে গড়িমসি ও অব্যবস্থাপনার নানান অভিযোগে জর্জরিত হয় বিপিএলের ১১তম আসর। সেসব থেকে শিক্ষা নিয়ে ১২তম সংস্করণের আগেই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে বিসিবি। সব দলের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি ও গ্যারান্টি অর্থ নিয়ে রেখেছে তারা।
আগের আসরের দুর্নীতি তদন্তের রিপোর্টে নয়জন খেলোয়াড়কে অকশনে আমন্ত্রণ না করা হয়। অর্থনৈতিক সংকটে বিদেশি তারকারা (যেমন ডিকওয়েলা, স্টার্লিং) চলে যান। এর মাঝে টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন সরে দাঁড়ায় চট্টগ্রাম রয়্যালস ফ্র্যাঞ্চাইজি। তবে একদমই সময় নষ্ট না করে চট্টগ্রামের দায়িত্ব নিয়ে নেয় বিসিবি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিল, খেলোয়াড়দের বেতন না দেওয়ার অভিযোগ, ম্যাচের আগে এক কোচের মৃত্যু। লিগের মান নিয়ে প্রশ্ন, দুর্নীতি দমনে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যদিও এবারের বিপিএলে কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এবারের বিপিএলের আগে ফিরিয়ে আনা হয় নিলাম পদ্ধতি। এছাড়া ব্রডকাস্টিংয়ের মান উন্নয়নে টিপিটি গ্লোবালের সঙ্গে চুক্তি, ম্যাচ ফিক্সিং রোধে আইসিসি ও সিআইডির সহায়তা নিয়ে জিরো টলারেন্স নীতিসহ আরও বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি। যা বিপিএল নিয়ে নতুন করে আশা দেখাচ্ছে।
অধিনায়কত্বের নাটক
নাজমুল হোসেন শান্তর সঙ্গে বোর্ডের যোগাযোগের চরম ভাঙন। জুন মাসে শ্রীলঙ্কা সফরের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তাকে ওয়ানডে অধিনায়কত্ব থেকে সরিয়ে মেহেদি হাসান মিরাজকে দেয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ শান্ত টেস্ট অধিনায়কত্বও ছেড়ে দেন। পরে আলোচনায় ফিরে আসেন এবং ২০২৫-২৭ ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ সাইকেলের জন্য টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে পুনর্বহাল হন। এই ঘটনা ক্রিকেটারদের মনোবলকে করেছে ছিন্নভিন্ন এবং বোর্ডের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ। নভেম্বরে টি-টোয়েন্টিতে লিটন দাস ও নির্বাচকদের মধ্যে শামীম হোসেনকে নিয়ে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে।
সব মিলিয়ে ২০২৫ ছিল অর্জনের চেয়ে বিতর্কে ভরা বছর। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, কবে শান্তি ফিরবে এই খেলায়?
