সুমন দেবনাথ: শিশুসাহিত্যের আকাশে এক দীপ্ত তারা নিভে গেল।
কালজয়ী ছড়াকার, একুশে পদকপ্রাপ্ত সুকুমার বড়ুয়া আজ ভোর ৬টা ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রামের রাউজানস্থ জে কে মেমোরিয়াল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। এই বাক্যটি শুধু একটি দুঃসংবাদ নয়, এটি আমাদের সাহিত্যিক মানচিত্রে এক গভীর শূন্যতার ঘোষণা। তাঁর চলে যাওয়া কেবল একজন লেখকের মৃত্যু নয়—এটি আমাদের শৈশবের এক অমল স্মৃতির ম্লান চিহ্ন, কল্পনার এক নিঃশব্দ সুরের শেষ গ্রন্থনা।
তাঁর প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল শিশুদের কল্পনার জগতে জ্বলে থাকা এক নরম, দীপ্ত আলো। তিনি ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁরা বিশ্বাস করতেন—শিশু মানেই অসম্পূর্ণ মানুষ নয়, বরং সবচেয়ে সংবেদনশীল ও সত্যগ্রাহী পাঠক।
বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে সুকুমার বড়ুয়ার নাম উচ্চারিত হবে নীরব শ্রদ্ধার সঙ্গে। তিনি এমন এক ধারার প্রতিনিধি ছিলেন, যেখানে গল্পে চমক নয়, মমতা ছিল; ভাষায় কৃত্রিমতা নয়, স্বচ্ছতা ছিল; আর শিক্ষায় ভয় নয়, আনন্দ ছিল। তাঁর লেখায় শিশুদের কী কী শেখানো হয়নি সেটা খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে, বরং তাঁর লেখায় শেখানো হয়েছে কীভাবে ভাবতে হয়। এটাই ছিল তাঁর সাহিত্যদর্শনের মূল শক্তি।
এক সময় শিশুসাহিত্য ছিল মানুষের ভেতরের মানুষটিকে গড়ে তোলার কারখানা। সেখানে কল্পনা ছিল মুক্ত, ভাষা ছিল কোমল, আর মানবিকতা ছিল স্বাভাবিক। সুকুমার বড়ুয়া সেই সময়ের উত্তরাধিকার বহন করেছেন নিভৃতে, নিরলসভাবে। আজকের দ্রুতগতির, বাজারমুখী শিশুসাহিত্যের ভিড়ে দাঁড়িয়ে তাঁর মতো লেখকের প্রস্থান তাই আরও বেদনাদায়ক। তাঁর চলে যাওয়া আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমরা কি আমাদের শিশুসাহিত্যিকদের যথাযথ মর্যাদা দিতে পেরেছি? জীবদ্দশায় তাঁদের কাজ নিয়ে আলোচনা, গবেষণা, পুনঃপাঠের যে পরিসর তৈরি হওয়ার কথা ছিল,
তা কি আমরা করেছি? নাকি মৃত্যুর পর কয়েকটি আবেগঘন পোস্টেই দায় সেরে ফেলছি? সুকুমার বড়ুয়ার সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে শিশুদের কল্পনায়। যে সমাজ শিশুদের জন্য সুন্দর ভাষা, মানবিক গল্প আর নৈতিক সাহস তৈরি করতে পারে না, সে সমাজ ভবিষ্যতে গভীর সংকটে পড়ে। শিশুসাহিত্য তাই কোনো ছোট সাহিত্য নয়; এটি সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণের সবচেয়ে নীরব কিন্তু শক্তিশালী হাতিয়ার।
আজ তিনি নেই। কিন্তু তাঁর লেখা রয়ে যাবে—কোনো শিশুর প্রথম বইয়ের পাতায়, কোনো পাঠকের শৈশবস্মৃতির ভেতরে, কিংবা ভাষার প্রতি নিঃশব্দ ভালোবাসার উৎস হিসেবে। আমাদের দায়িত্ব এখন সেই আলোকে ধরে রাখা, নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়া, যেন এই নক্ষত্র নিভে গিয়েও পথ দেখায়।
শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়—
একজন প্রকৃত শিশুসাহিত্যিককে বিদায়।
শিশুদের আকাশ আজ একটু বেশিই নীরব।
