More

    সংস্কার না গালি? নতুন রাজনীতির নগ্ন চেহারা

    অবশ্যই পরুন

    মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ : বর্তমান সময়ে “সংস্কার” শব্দটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত, আবার সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত শব্দে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি—সবকিছুতেই সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। সভা-সমাবেশে, মিছিলে, টকশোতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে— সংস্কার যেন এক অলৌকিক মন্ত্র, যা উচ্চারণ করলেই কেউ নৈতিকভাবে শুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা নির্মম। যত বেশি সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, তত বেশি আমরা নৈতিক অবক্ষয়ের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি।

    সংস্কার মানে কেবল পুরোনো কাঠামো ভাঙা নয়, সংস্কার মানে শুদ্ধি। চিন্তার শুদ্ধি, ভাষার শুদ্ধি, আচরণের শুদ্ধি। অথচ আজকের রাজনীতিতে সংস্কারের নামে যা চলছে, তা শুদ্ধি নয়—তা এক ধরনের উন্মুক্ত অবাধ্যতা ও অশালীনতার চর্চা। ভাষা হয়ে উঠেছে আক্রমণের হাতিয়ার, গালি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক পরিচয়।

    সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ভাষাগত অবক্ষয়কে এখন “প্রতিবাদের ভাষা” হিসেবে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। যে শব্দগুলো একসময় সভ্য সমাজে উচ্চারণ অযোগ্য ছিল, সেগুলো এখন মিছিলের স্লোগান, ফেসবুক স্ট্যাটাস ও লাইভ ভিডিওর অলংকার। লজ্জা, শালীনতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা—সবকিছু যেন ইচ্ছাকৃতভাবে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে সাহসী রাজনীতি, প্রগতিশীল আন্দোলন।

    এই অবক্ষয়ের দায় শুধু রাজনীতিবিদদের নয়; দায় তরুণ সমাজের একটি বড় অংশেরও। দেশের মানুষ আশা করেছিল, তরুণরাই হবে পরিবর্তনের বাহক, তারাই ভাঙবে দুর্নীতির দেয়াল, তারাই ফিরিয়ে আনবে নৈতিক রাজনীতি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, তরুণদের একাংশ আদর্শ নয়, অনুসরণ করছে সুবিধা। তারা প্রতিবাদী নয়, তারা সুযোগসন্ধানী। তারা রাষ্ট্র বদলাতে চায় না, তারা শুধু ক্ষমতার বৃত্তে ঢুকতে চায়। আরও দুঃখজনক হলো—এই অশালীন ভাষা ও আচরণে শিক্ষিত সমাজ এবং নারীদের একটি অংশও জড়িয়ে পড়ছে। এটি কোনো মুক্তির লক্ষণ নয়, এটি গভীর সামাজিক সংকটের ইঙ্গিত।

    নারীর ক্ষমতায়ন মানে শালীনতা ভেঙে ফেলা নয়, মুক্তচিন্তা মানে কুরুচির লাইসেন্স নয়। যখন শিক্ষিত মানুষের মুখে রুচিহীন গালি শোনা যায়, তখন বুঝতে হবে সংস্কার ব্যর্থ হয়েছে। গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মতভেদ আর অসম্মানের পার্থক্য বুঝতে না পারলে গণতন্ত্র টিকে না। আজ প্রবীণ মানুষ, ভিন্নমতাবলম্বী, বুদ্ধিজীবী—কারও রেহাই নেই। যুক্তির জায়গায় গালি, বিতর্কের জায়গায় চরিত্রহনন—এটাই এখনকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এটি সংস্কার নয়, এটি ফ্যাসিবাদী মানসিকতার সামাজিক রূপ। রাজনীতি যখন নৈতিকতা হারায়, তখন রাষ্ট্র শুধু ক্ষমতার যন্ত্রে পরিণত হয়।

    আইন থাকে, কিন্তু ন্যায় থাকে না। নির্বাচন থাকে, কিন্তু বিশ্বাস থাকে না। আন্দোলন থাকে, কিন্তু আদর্শ থাকে না। আজ আমরা সেই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে শব্দ দিয়ে মানুষ উত্তেজিত হয়, কিন্তু কাজ দিয়ে কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না। সংস্কার যদি সত্যিই হতো, তাহলে আগে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরিত্র বদলাতো। দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির কথা বলা হতো। গালি নয়, যুক্তি হতো অস্ত্র। কিন্তু এখানে সংস্কার মানে শুধু শত্রু বদল, ক্ষমতার হাতবদল। কাঠামো একই থাকে, শুধু মুখ বদলে যায়।

    একটি রাষ্ট্র কেবল অর্থনীতি বা অবকাঠামো দিয়ে শক্তিশালী হয় না; রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় তার নাগরিকের নৈতিকতায়। আজ সেই নৈতিকতা যখন প্রকাশ্যে ধ্বংস হচ্ছে, তখন কোনো সংস্কারই আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। তরুণ সমাজ যদি এখনই নিজের ভূমিকা না বোঝে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। সংস্কার চাই—কিন্তু তা স্লোগানে নয়, আচরণে। গালিতে নয়, নৈতিক সাহসে।

    ক্ষমতার লোভে নয়, ত্যাগের রাজনীতিতে। না হলে ইতিহাস একদিন আমাদের দিকে আঙুল তুলে বলবে—তোমরা সংস্কারের কথা বলেছিলে, কিন্তু তোমরাই সমাজটাকে ভেঙে দিয়েছিলে।

    সম্পর্কিত সংবাদ

    সর্বশেষ সংবাদ

    কুয়াকাটা সৈকতে আবারও মৃত ডলফিন

    পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে আবারও একটি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে। শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) সকালে কুয়াকাটা সৈকতের পশ্চিম পাশের স্বপ্নরাজ্য পার্ক...