আসন বণ্টন নিয়ে টানাপোড়েনের পর চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনকে ছাড়াই ২৫৩ আসনে সমঝোতা করেছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ ১০ দল। এর মধ্যে তিনটি আসন একাধিক শরিকের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে তাদের নির্বাচনী ঐক্যের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। মঞ্চে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য চেয়ার রাখা হলেও দলটির কেউ উপস্থিত ছিলেন না। দায়িত্বশীল সূত্রের ভাষ্য, জামায়াতের জোটের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন থাকছে না।
তারা আলাদা সমঝোতার চেষ্টা করলেও তাদের আগের মিত্র দলগুলো বিকল্প জোটের প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে, কয়েকটি করে আসন বাড়িয়ে নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য করেছে। ইসলামী আন্দোলন গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠক এবং রাতে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলন বর্জন করলেও, দলটির জন্য পাঁচটি উন্মুক্তসহ ৪৭ আসন রাখা হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন আজ শুক্রবার দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান জানাবে। শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন নির্বাচনী ঐক্যে না এলে ফাঁকা রাখা আসনগুলোতে জামায়াতের প্রার্থীরা নির্বাচন করবেন। এ ছাড়া গতকাল সমঝোতা হওয়া আসনগুলোর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা-১ আসন নেই বণ্টন তালিকায়। পাশাপাশি তালিকায় এনসিপির জন্য ২৭ আসন বরাদ্দ রাখা হলেও দলটি চুয়াডাঙ্গা-১ এবং আরও তিনটি আসন পেতে পারে। কিশোরগঞ্জ-১ দুই খেলাফতের জন্য এবং ফরিদপুর-৪ আসন ইসলামী আন্দোলন এবং বাংলাদেশ খেলাফতের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
পিরোজপুর-৩ আসন এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলন দুই দলকেই দেওয়া হয়েছে। ফলে ২৫৩ আসনে সমঝোতার কথা বলা হলেও বণ্টন হয়েছে ২৪৯ আসন। জামায়াত নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছেন, তারা আশাবাদী ইসলামী আন্দোলন নির্বাচনী ঐক্যে যোগ দেবে। তবে চরমোনাইয়ের পীরের দলের কেউ মুখ খোলেননি। আজ শুক্রবার বিকেল ৩টায় দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তারা অবস্থান জানাবেন। ঘোষণা অনুযায়ী জামায়াত ১৭৯ আসনে নির্বাচন করবে। তবে ইসলামী আন্দোলনের যে পাঁচটি উন্মুক্ত আসন রাখা হয়েছে, এর চারটিতে থাকবে জামায়াতেরও প্রার্থী।
ফলে হাতপাখার সঙ্গে সমঝোতা হলে দাঁড়িপাল্লা থাকবে ১৮৩ আসনে। যদিও যে তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে জামায়াতের প্রার্থী সংখ্যা ১৮২ এবং এনসিপির ২৭। তবে এর আগে এনসিপিকে তিনটি আসন ছাড়া হয়। তবে এগুলো কোন কোন আসন, তা গতকাল রাত পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি। সমঝোতা অনুযায়ী, এনসিপি ৩০, দুটি উন্মুক্তসহ মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০, একটি উন্মুক্তসহ খেলাফত মজলিসের অপরাংশ ১০, এলডিপি ৭, এবি পার্টি তিন এবং নেজামে ইসলাম পার্টি ও বিডিপি দুটি করে আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। ঐক্যের অপর দুই শরিক জাগপা এবং খেলাফত আন্দোলন কোনো আসন পাচ্ছে না। দল দুটিকে ভবিষ্যতে উচ্চকক্ষে আসন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ঐক্যের একক প্রার্থী ঘোষণায় গত বুধবার সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিল জামায়াত। তবে চরমোনাই পীরের দল এতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে, তা স্থগিত করা হয়। ইসলামী আন্দোলন ৭০ আসনের কমে নির্বাচনী ঐক্যে রাজি হয়নি। বরং বুধবার দলীয় বৈঠকের পর আভাস দিয়েছিল, অন্যান্য মামুনুল হকের খেলাফত, নেজামে ইসলাম, খেলাফত মজলিসের অপরাংশ, খেলাফত আন্দোলনসহ ইসলামী দলের সঙ্গে বিকল্প জোট হতে পারে। জামায়াত কার্যালয়ে বৈঠকে চূড়ান্ত বুধবার তৎপরতা চালিয়ে হেফাজতে ইসলামের অন্যতম নেতা মামুনুল হকসহ অন্য নেতাদের নিজের পক্ষে রাখে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ইসলামী আন্দোলন বাদে বাকি দলের নেতারা রাজধানীর মগবাজারে জামায়াত কার্যালয়ে আসন সমঝোতা চূড়ান্তে বৈঠকে বসেন। একমাত্র চরমোনাই বাদে সব দলের প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে আসায় নিশ্চিত হয়ে যায়– জামায়াতের সঙ্গে রয়েছেন তারা।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরের সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু, এলডিপির প্রেসিডিয়াম সদস্য লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) হাসান সোহরাওয়ার্দী, খেলাফত মজলিসের অপরাংশের মাহসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বিডিপির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম এবং খেলাফত আন্দোলন ও নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিনিধিরা। এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, তাদের আসন সমঝোতার নাম হবে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য। ন্যূনতম ঐকমত্যের স্মারক সই হবে। যৌথভাবে নির্বাচনী ইশতেহার এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ঘোষণা করা হবে। মজিবুর রহমান মঞ্জু সমকালকে বলেছেন, এবি পার্টি প্রস্তাব করেছে, কিছু আসন উন্মুক্ত রাখা হোক। যেখানে সব দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার পরিকল্পনা ঘোষণা করে গত মে মাসে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত, মাওলানা বাছিত আযাদের খেলাফত মজলিস, নেজামী ইসলাম পার্টি, খেলাফত আন্দোলন এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম মোর্চা গঠনের আলোচনা শুরু করে। পরে জমিয়ত চলে যায় বিএনপির জোটে। যুক্ত হয় জামায়াত। প্রথম পাঁচটি দলকে নিয়ে পৃথক জোট গঠনে গত দুদিন ইসলামী আন্দোলন প্রচেষ্টা চালালেও এতে ফল হয়নি। ডা. তাহের সমকালকে বলেছেন, এখনও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। আশা করছেন দলটি জোটে থাকবে। সংবাদ সম্মেলনে ১০ দল চরমোনাই পীরের অপেক্ষায় এক ঘণ্টা বিলম্বে রাত ৯টায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়।
মঞ্চে ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের নাম লেখা চেয়ার রাখা ছিল। দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য আলী আশরাফ আকন সন্ধ্যায় সমকালকে জানান, তারা যাচ্ছেন না সংবাদ সম্মেলনে। ফলে ব্যানারে ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ লেখা হলেও তা ১০ দলের সংবাদ সম্মেলনে পরিণত হয়। আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন, ২৫৩ আসনে সমঝোতা হয়েছে। কিছু আসনে সমস্যা রয়েছে, যা প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর ঠিক হবে। ১৭ জানুয়ারির মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা হবে। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, যাকে যেখানে দেওয়া হয়েছে তারা ১১ দলের এবং দেশবাসীর প্রার্থী।
নির্বাচনী ঐক্যকে ঐতিহাসিক বলে আখ্যা দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সংস্কারের পক্ষে, বাংলাদেশের আজাদির পক্ষে বৈষম্য ও দুর্নীতিবিরোধী দলগুলো একটি প্ল্যাটফর্মে এসেছি। ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন এবং গণভোটে অংশ নেব। বিএনপির জোট ছেড়ে জামায়াতের সঙ্গে আসা এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবীক্রমও নির্বাচনী ঐক্যকে ঐতিহাসিক বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এই ঐক্যকে মানুষ গ্রহণ করেছে। মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আমাদের যাত্রা জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। এরপর সংস্কার, জুলাই সনদের আইনিভিত্তিসহ নানা দাবিতে রাজনীতির দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এতদূর এসেছি। প্রতিটি আসনে ঐক্যের একজনই প্রার্থী থাকবেন। চরমোনাই পীরে অনাগ্রহী জামায়াত নির্বাচনী ঐক্য সূত্র জানিয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের দল এনসিপি, বীর মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্বাধীন এলডিপি এবং হেফাজত নেতা মামুনুল হকের খেলাফতকে পাশে পাওয়ার পর জামায়াত আর ইসলামী আন্দোলনকে ৭০ আসন দিয়ে ঐক্যে ধরে রাখতে আগ্রহী নয়।
জামায়াত কার্যালয়ে বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন নেতা সমকালকে বলেছেন, জামায়াত হাতপাখাকে সর্বোচ্চ ৪৫টি আসন ছাড়তে রাজি। এতে দলটি রাজি না হলে ইসলামী আন্দোলনকে ঐক্যে আনার জন্য চেষ্টা করবে না। এ জন্য জামায়াত হেফাজতের ঘনিষ্ঠ দুই খেলাফতের আসন শেষ সময়ে বাড়িয়েছে। মামুনুল হকের খেলাফতকে ১৬ এবং অপর খেলাফতকে সাতটি আসন ছাড়তে রাজি ছিল জামায়াত। বৈঠক সূত্রের খবর, শেষ সময়ে মামুনুল হককে ২০টি এবং খেলাফতের অপরাংশকে ১০টি আসন ছেড়ে দেয় জামায়াত। জামায়াতের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা সমকালকে বলেছেন, তাদের জরিপ অনুযায়ী, ইসলামী আন্দোলন সাংগঠনিকভাবে গোছানো হলেও সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ ভোট রয়েছে। এনসিপির জনসমর্থন ৭ শতাংশ।
তাই ইসলামী আন্দোলনকে বাড়তি গুরুত্ব দিতে রাজি নয় জামায়াত। এবারের নির্বাচনে ২৭৬ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল জামায়াত। এনসিপির জন্য সাত, বাংলাদেশ খেলাফতের জন্য আট, খেলাফত মজলিসের জন্য চার, বিডিপি এবং এবির জন্য দুটি করে প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। এলডিপির জন্য একটি আসনে প্রার্থী দেয়নি। কিন্তু ২৬৬ আসনে প্রার্থী দেওয়া ইসলামী আন্দোলনের জন্য একটি আসনও খালি রাখেনি জামায়াত। দলীয় সূত্রের খবর, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে ঐক্য ভাঙতে পারে– এমন আশঙ্কা থেকেই এ কৌশল ছিল। জামায়াতের জোটের বিরোধীরা সংবাদ সম্মেলনে সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমিরের ঠিক পেছনের চেয়ারে বসেন এনসিপির নির্বাচন পরিচালানা কমিটির সদস্য সচিব মনিরা শারমিন।
তিনি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের প্রতিবাদে নওগাঁ-৫ আসন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে নিজেকে বিরত রাখার ঘোষণাও দিয়েছিলেন। তবে গতকাল তিনি এনসিপির নির্বাচন পরিচালানা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ ছেড়ে এনসিপিতে যোগ দেওয়া আসিফ মাহমুদও জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরুদ্ধে ছিলেন।
