মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ : এটি কোনো ব্যক্তিগত গল্প নয়। এটি কোনো একক গ্রামের আর্তনাদও নয়। এটি দক্ষিণ বাংলার এক বিশাল জনপদের দীর্ঘ পনেরো বছরের নীরব কান্না—যে কান্না শোনা হয়নি, বোঝা হয়নি, আর সমাধানও হয়নি। বিষখালী ও বলেশ্বর—দুটি প্রবহমান নদীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার গল্প আজ জনস্বার্থে, সারা দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরা সময়ের দাবি। পাঠকের কাছে বিনীত নিবেদন, জনস্বার্থে শেয়ার কমেন্টস, লাইক দিয়ে বহুল প্রচার করে জনদুর্ভোগ লাঘবে সহযোগিতা করবেন।
সাথে আরো যুক্ত করছি–জনস্বার্থে বলা, লেখার জন্য যদি আমার কোন অপরাধে দোষী হয়ে থাকি তাহলে ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া আমার অন্য কোন পথ নেই। যেখানে নদী ছিল জীবনের উৎস, সেখানে আজ বাঁধ হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃত্যুর দেয়াল। যেখানে পানি ছিল আশীর্বাদ, সেখানে আজ সেই পানিই অভিশাপ।প্রশ্ন জাগে—এই রাষ্ট্রে কি আদৌ কোনো সরকার আছে? জনসেবার জন্য কি সরকারি কর্মকর্তারা আছেন? থাকলে এই দুর্ভোগ দেখার দায়িত্ব কার? পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলায় মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা গ্রামে বিষখালী ও বলেশ্বর দুই নদীর সংযোগ প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ঐতিহাসিক খাল রয়েছে।
এই খালকে ঘিরে পাশাপাশি চারটি উপজেলার, ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে কৃষি, মৎস্য, নৌ-যাতায়াত ও জীবিকার নির্ভরতা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু আজ সেই খাল মৃত্যুপথযাত্রী। মিরুখালী ইউনিয়নের বাদুরা গ্রামের “দোগনা খাল” ও “ভূতা খাল” এ প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে একাধিক অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করেছে।
৭০–৮০ ফুট প্রশস্ত এই সরকারি খাস খাল কেউ ভরাট করেছে। কেউ মাছ চাষ করছে, কেউ দখল নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে, আবার কেউ খালের প্রশস্ততা সংকুচিত করে রেখেছে। প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে—একেবারে যেন অন্ধ রাজার শাসন চলছে অমাবশ্যার মাঠে। এই অবৈধ বাঁধের কারণে বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে একদিকে বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে তীব্র পানি সংকট। একসময় যেখানে তিন ফসল হতো, সেখানে এখন এক ফসলও অনিশ্চিত হয়না। প্রায় চার হাজার একর কৃষিজমি বছরের পর বছর অনাবাদি পড়ে আছে।
কৃষক কর্মহীন, মৎস্যজীবী বেকার, পরিবারগুলো জীবিকা হারিয়ে শহরমুখী। এই অঞ্চলের জলাশয়গুলো একসময় ছিল মাছের স্বর্গ। নদীর জোয়ারের সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের রেণু পোনা খাল, ডোবা, পুকুর ও ধানক্ষেতে ঢুকে পড়ত। এখান থেকে শত শত মণ শুঁটকি ও গলদা চিংড়ি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হতো। আজ সেই সব স্মৃতি শুধুই গল্প।
অবৈধ বাঁধ সবকিছু থামিয়ে দিয়েছে। মিরুখালী –সাফা সড়ক ভাঙ্গনের চক্রে চলমান। দুর্ভোগের চিত্র এতটাই ভয়াবহ যে জলাবদ্ধতার কারণে মৃত মানুষকেও স্বাভাবিকভাবে দাফন করা যায় না। ইট-বালু দিয়ে উঁচু কবর বাঁধতে হয়। এটি কি সভ্য রাষ্ট্রের চিত্র?
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—এই সমস্যার কথা নতুন নয়। গত পনেরো বছরে এলাকাবাসী অসংখ্যবার ডিসি, ইউএনও, বাপাউবো, কৃষি অফিস, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়—সব দরজায় কড়া নেড়েছে। শত শত মানুষের স্বাক্ষরযুক্ত আবেদন, মানববন্ধন, আন্দোলন, জাতীয় পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রতিবেদন হয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বহুবার পরিদর্শন, তদন্ত প্রতিবেদন ও বাঁধ অপসারণের নির্দেশনাও রয়েছে। সংসদ সদস্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা বহুবার পরিদর্শন করেছেন। বাঁধ অপসারণে বাপাউবো বরিশাল, পরিবেশবাদী সংগঠন (বেলা)’র হাইকোর্টের বাঁধ অপসারণ নির্দেশনাও রয়েছে।তবুও অদৃশ্য কারণে বাস্তবায়ন নেই। যেখানে বাঁধ অপসারণে সরকারি একাধিক তদন্ত প্রতিবেদন রয়েছে সেখানে মব জাস্টিস এর কাছে বড় অসহায় ঐ সব তদন্ত প্রতিবেদন।
আরও দুঃখজনক হলো— জনস্বার্থে কথা বললেই কেউ অপরাধী হয়ে যায়। প্রভাবশালী মহলের বাধার মুখে সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা নীরব থাকে। কেউ কেউ তো স্বাভাবিকভাবে জনদুর্ভোগ শুনতেও চায় না। এ কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই অপরাধ? মঠবাড়িয়ার কৃতি সন্তান ব্যারিস্টার আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে যখন বাঁধ অপসারণ আন্দোলন জোরদার হয়, তখনও এক শ্রেণির রাজনৈতিক চর্চাকারী মানুষ ব্যক্তিস্বার্থে সেই উদ্যোগের বিরোধিতা করে বসে।
যেন মানুষের সম্মান বাঁধে আটকে আছে, আর মানুষের জীবন মূল্যহীন। ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি গ্রামবাসী যখন বাধ্য হয়ে বাঁধ অপসারণের ঘোষণা দেয়, তখন প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ১ লা জানুয়ারী সভা বসে। ইউএনও, সেনাবাহিনীর ক্যাম্প চিফ, পুলিশ প্রশাসনের উপস্থিতিতে দুই মাসের মধ্যে বাঁধ কেটে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু মাস যায়, বছর যায়— প্রতিশ্রুতি কাগজেই পড়ে থাকে।
মাঠে কোনো পরিবর্তন আসে না। আরও দুঃখজনক হলো— জনস্বার্থে কথা বললেই কেউ অপরাধী হয়ে যায়। এই লেখা কোনো প্রতিহিংসা নয়, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যও নয়। এটি জনস্বার্থের আর্তনাদ। প্রশ্ন একটাই—এই সমস্যার সমাধান কার হাতে? যদি সরকার থাকে, তবে দায়িত্ব কার? যদি সরকারি কর্মকর্তা থাকেন, তবে তারা কেন দায়িত্ব নেন না?
জনদুর্ভোগ নিরসন ও এলাকার পরিবেশ রক্ষার্থে নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহ উপস্থাপন করা হলো—
১.লাইনের “দোগনা খাল”র ৩টি অবৈধ বাঁধ অপসারণ ও ২টি ছোট ব্রিজ নির্মাণ।
২.”ভূতা খাল”র ২টি অবৈধ বাঁধ অপসারণ এবং খালের মুখে ১টি স্লুইসগেট নির্মাণ।
৩.নাপিত বাড়ি খালের অবৈধ বাঁধ অপসারণ ও স্লুইস গেট নির্মাণ। —
এগুলো কোনো অসম্ভব দাবি নয়। এগুলো বাস্তবায়ন হলে লক্ষাধিক মানুষের জীবন আবার স্বাভাবিক হবে, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন ফিরবে, রাষ্ট্রও শত শত কোটি টাকার ক্ষতি থেকে বাঁচবে। এ প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আকলিমা আক্তার বলেন,এলাকা পরিদর্শন করেছি বাঁধ অপসারণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আর কত বছর অপেক্ষা করবে মঠবাড়িয়া? আর কত কান্না জমলে প্রশাসনের চোখ খুলবে? জনস্বার্থে আজ এই প্রশ্ন সারা দেশের মানুষের কাছে রেখে গেলাম। কারণ নীরবতা আর সহ্য করার নাম নয়—নীরবতাও এক ধরনের অপরাধ।
