More

    পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি’র বিদ্রোহী স্বতন্ত্র হাসান মামুন কেন হারলেন?

    অবশ্যই পরুন

    গলাচিপা প্রতিনিধি : পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা–দশমিনা) আসনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল শুধু একটি নির্বাচনি লড়াই নয়; বরং এটি দুই উপজেলার রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা, গভীর বিভাজন এবং সাংগঠনিক সংকটের স্পষ্ট প্রতিফলন।

    দীর্ঘদিনের ছাত্ররাজনীতি ও তৃণমূল সংগঠনের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা নেতা হাসান মামুন ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে নিজ এলাকা গলাচিপায় দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক রাজনীতি করে শক্তিশালী একটি মাঠ তৈরি করেন। তৃণমূল পর্যায়ে তার বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও পটুয়াখালী-৩ আসনে তাকে মনোনয়ন না দিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ভিপি নুরুল হক নুরকে সমর্থন দেয়।

    জোটের এই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের গতিপথ ঘুরিয়ে দেয়। বিএনপি ও শরিক দলগুলোর ভোটব্যাংক মূলত জোট প্রার্থীর দিকে সরে যায়, যা হাসান মামুনের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
    দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপি তাকে বহিষ্কার করে। একইসঙ্গে গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলার বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এসব সিদ্ধান্ত তার নির্বাচনি অবস্থানকে দুর্বল করে দেয় এবং সংগঠনের ভেতরে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

    যদিও স্থানীয় বিএনপির একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত হাসান মামুনের পক্ষেই অবস্থান নেয়, তবে জোট প্রার্থী ভিপি নুরুল হক নুরের পক্ষেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটার সক্রিয় ছিলেন। ফলে ভোট বিভাজন সৃষ্টি হয়, যা হাসান মামুনের জয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

    স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হাসান মামুনকে দলীয় প্রতীক ধানের শীষের পরিবর্তে ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে হয়। এতে অনেক সাধারণ ভোটারের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
    নির্বাচনি প্রচারণা চলাকালে তার কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। একইসঙ্গে তার নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের অভিযোগও ওঠে, যা প্রচার কার্যক্রমে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে।

    এদিকে গলাচিপা এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পুরোনো ও নতুন মামলা দায়েরের ঘটনায় দলটির কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী না থাকায় প্রায় ৪৬ বছর পর এই আসনে তাদের ভোট একটি বড় নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়। ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ভিপি নুরুল হক নুরের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

    নির্বাচনের আগেই স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপির বহু ত্যাগী নেতাকর্মী বহিষ্কার হন এবং একাধিক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। পরবর্তীতে নতুন কমিটি গঠন করা হলেও এসব কমিটির নেতারা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে জোট প্রার্থীর পাশে দাঁড়ান। তবে বহিষ্কৃত নেতাকর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দলে এক ধরনের অস্বস্তি ও সম্ভাব্য সংঘাতের শঙ্কা রয়ে গেছে।

    রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যারা বছরের পর বছর হামলা-মামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের কাছে এই নির্বাচন ছিল মূল্যায়নের একটি বড় পরীক্ষা। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপ তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে।

    শেষ পর্যন্ত পটুয়াখালী-৩ আসনে বিজয়ী হন বিএনপি সমর্থিত গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ভিপি নুরুল হক নুর। অপরদিকে হাসান মামুনের পরাজয়ের পর তার সমর্থক ও বহিষ্কৃত নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও স্থানীয় মানুষের কাছে হাসান মামুন পরিচিত একজন সেবামুখী সমাজসেবক হিসেবে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব আন্দোলনে নিহত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, করোনা মহামারিতে খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান, শীতকালে কম্বল বিতরণ, পথশিশুদের সহায়তা, ক্রীড়া আয়োজনের মাধ্যমে তরুণদের সুস্থ বিনোদনে যুক্ত করা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি—সব মিলিয়ে তার মানবিক কর্মকাণ্ড এলাকায় আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।

    ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আর্থিক সহায়তা দিয়ে তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছেন।

    বিশ্লেষকদের মতে, পটুয়াখালী-৩ আসনের এই নির্বাচন বিএনপির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তৃণমূলের ক্ষোভ প্রশমন, গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ছাড়া দলীয় ঐক্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

    এই আসনের নির্বাচন তাই বিএনপির সামনে এক কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা—যেখানে বিজয়ের পাশাপাশি বিভাজন ও পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছে। দল ঐক্যের পথে ফিরতে পারবে, নাকি এই বিভাজন দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর সংকট তৈরি করবে—সেই প্রশ্নই এখন পটুয়াখালী-৩ এর মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে।

    সম্পর্কিত সংবাদ

    সর্বশেষ সংবাদ

    বিডিআর হত্যা মামলায় আসামি হচ্ছেন হাসিনাসহ একাধিক আ.লীগ নেতা

    বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও বিস্ফোরক মামলায় আসামি করা হবে শেখ হাসিনা, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, ফজলে নূর তাপসসহ তৎকালীন...