শীতের দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে এক সকালে প্রকৃতি হঠাৎ করেই যেন কথা বলতে শুরু করে। বাতাসের কণায় কণায় ভেসে আসে আলাদা এক গন্ধ—নরম, উষ্ণ, আশ্বাসে ভরা। এটাই বসন্তের আগমনী বার্তা। ঋতুচক্রের এই বাঁকে প্রকৃতি শুধু রং বদলায় না, বদলে যায় তার মনখানা—নীরব থেকে উচ্ছ্বল, নিস্তব্ধ থেকে উৎসবমুখর। গাছের ডালে ডালে নতুন পাতার কুঁড়ি ফোটে নিঃশব্দে, কিন্তু তাদের উপস্থিতি ঘোষণা দেয় জোরালভাবে।
শিমুলের লাল, পলাশের আগুনরঙা ছোঁয়া, কৃষ্ণচূড়ার উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন সাজে বর্ণিল পোশাকে। মাঠ-ঘাট, পথের ধারে, নদীর পাড়ে—যেদিকে তাকাই, সেদিকেই বসন্তের আলোকোজ্জ্বল হাসি। সূর্যও আজকাল আলাদা করে আলো দেয়; তার তাপ নরম, চোখে লাগে না, বরং মনের ভেতর উষ্ণতা ঢেলে দেয়। পাখিরাও বসন্তে নতুন গান শেখে। ভোরের বাতাসে তাদের কণ্ঠে ভেসে আসে ডাকে-ডাকে আনন্দের সুর। ডালিমের ফুলের পাশে দাঁড়িয়ে তারা যেন ঘোষণা দেয়—এ সময়টা উদযাপনের।
নদীর জলে পড়ে রোদের ঝিকিমিকি, বালুচরে ছায়া-আলো খেলতে থাকে; প্রকৃতির প্রতিটি দৃশ্যেই লুকিয়ে থাকে উৎসবের ইশারা। মানুষের মনও বসন্তে আলাদা করে সাড়া দেয়। ক্লান্ত দিনের শেষে হালকা বাতাসে হাঁটতে বেরোলে মনে হয়—জীবনটা আবার নতুন করে শুরু করা যায়। শহরের ব্যস্ততায়ও বসন্ত তার জায়গা করে নেয়; জানালার ধারে ফুলের টব, রাস্তায় হালকা হাসি, পোশাকে রঙের বাড়তি সাহস—সবই বসন্তের ছোঁয়া।
গ্রামগঞ্জে তো উৎসবের আমেজ আরও স্পষ্ট; খোলা আকাশের নিচে দুপুরের রোদে কাজের ফাঁকে ফাঁকে চোখে পড়ে স্বস্তির ঝিলিক। বসন্ত আসলে প্রকৃতির নিজস্ব উৎসব—কোনো আমন্ত্রণপত্র নেই, নেই নির্দিষ্ট মঞ্চ। তবু সবাই অংশ নেয়। গাছ, পাখি, মানুষ—সবার ভেতরেই জেগে ওঠে নবজাগরণের আনন্দ। এই ঋতু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রুক্ষতার পরও কোমলতা আসে; নীরবতার পর গান ফিরে পায় কণ্ঠ। বসন্ত তাই শুধু একটি ঋতু নয়—এ এক অনুভব।
প্রকৃতির বুকে বসে থাকা উৎসবের সেই আমেজ আমাদের শেখায়, জীবন যতই কঠিন হোক, ঠিকই একদিন রঙ ফিরে আসে। আর সেই রঙেই আমরা খুঁজে পাই নতুন করে বাঁচার আনন্দ।
