পিরোজপুর-নাজিরপুর-বৈঠাকাটা ১৭ কিলোমিটার সড়কের কাজ না করে অর্ধশত কোটি টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন পাঁচ ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ। সড়কের বেশির ভাগ জায়গায় পিচ-খোয়া উঠে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় অনেক খানাখন্দ। ফলে এ সড়কে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এ সড়ক ব্যবহারকারী কয়েক লাখ মানুষ।
জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পিরোজপুরের নাজিরপুর-বৈঠাকাটা-বানারিপাড়া সড়কের পিরোজপুর অংশের সাড়ে ১৬ কিলোমিটার সড়ক ছিল জনপদ (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যৌথ মালিকানাধীন।
২০১৫ সালের এক পত্রে নাজিরপুর-বৈঠাকাটা-বানারিপাড়া সাড়ে ১৬ কিলোমিটার সড়কটি সড়ক ও জনপদ বিভাগের অধীনে দেওয়া হয়। পরে ২০১৭ সালে আরেকটি পত্রের মাধ্যমে ওই সড়কের দায়িত্ব দেওয়া এলজিইডিকে। দুই দপ্তরের ভিন্ন ভিন্ন চিঠিতে মালিকানা প্রদান করায় সৃষ্টি হয় দাপ্তরিক জটিলতা। ফলে সড়কটি নির্মাণে দায়িত্ব কোনো দপ্তর নিচ্ছিল না। অবশেষে দাপ্তরিক জটিলতা নিরসন করে ২০২৪ সড়কটির মালিকানা পায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
এরপর এলজিইডি সড়কটি নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করলে কাজটি পান পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামীলীগ নেতা মহিউদ্দিন মহারাজের ছোট ভাই ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিরাজুল ইসলামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইফতি ইটিসিএল প্রাইভেট লিমিটেড। ২০২৪ সালের জুন মাসে কাজটি শুরু হয়ে ৪টি ধাপে ২০২৫ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজটি শেষ করার কথা ছিলো। তবে সড়ক নির্মাণের কাজ অদ্যাবধি শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি মেরামত না হওয়ায় ও এলাকার কয়েক লাখ মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারী লোকজন প্রতিনিয়ত ছোটখাট দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে অসুস্থ রোগীরা চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যেতে পারছে না। সড়ক চলাচল অনুপযোগী থাকায় যানবাহন চলাচল ব্যহত হওয়ায় যাত্রীদের অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা স্কুল,কলেজ ও মাদরাসায় যেতে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিনই সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন যাত্রীরা। সড়কের বেশিরভাগ জায়গায় পিচ-খোয়া উঠে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে ছোট, বড় গর্তের। বৃষ্টিতে পানি জমা এবং শুকনো মৌসুমে ধুলায় দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায় স্থানীয় মানুষের। বৈঠাকাটা ভাসমান বাজার থেকে উপজেলা সদরে প্রতিনিয়ত ছোট বড় শত শত গাড়ি এবং কয়েক হাজার মানুষ যাতায়াত করে। নাজিরপুর উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের জনগণের নাজিরপুর সদরে আসার রাস্তা এটি। রাস্তাটি নদীর পাশ দিয়ে মালবাহী ট্রাক চলাচলের কারণে কোথাও কোথাও রাস্তা নদীতে বিলীন হওয়ার পথে। সড়কের অবস্থা এতটাই বেহাল যে, প্রতিদিন চরম দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করে এখানকার মানুষ। জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স বা অন্যান্য গাড়ি পাওয়া নিয়েও তৈরি হয় শঙ্কা।
দীর্ঘদিন থেকে বৈঠাকাটা ভাসমান বাজারের ব্যবসায়ীরা বলেন, এই সড়ক বেহাল অনেক দিন ধরেই। সড়কের কোথাও খানাখন্দ আবার কোথাও ঢিবির মতো উঁচু-নিচু। সড়কটি একেবারেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফলে ট্রাক পাওয়া যায় না। ট্রাকচালকরা এ রাস্তায় আসতে চায় না। ট্রাক আনতে হলে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়।
স্থানীয়রা বলেন, রাস্তাটি ১৫ বছর ধরে কাজ হয় না। ৫ বছর ধরে খুবই বেহাল দশায় আছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে গিয়ে পৌঁছেছে। এ পথ দিয়ে এখন আর যাতায়াত করার কোনো অবস্থা নেই। মানুষ অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্সও এ রাস্তায় ঢুকতে চায় না। আমরা খুব কষ্টে দিন পার করছি। রাস্তার পাশের বাড়ি-ঘর ধুলায় লাল হয়ে আছে।
বৈঠাকাটা এলাকার বাসিন্দা রিপন শিকদার বলেন, নাজিরপুর-বৈঠাকাটা সড়কটি দিয়ে ৬ থেকে ৭ বছর ধরে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। পিচ ঢালাইয়ের রাস্তা দেখলে মনে হবে গ্রামের কোনো মেঠো পথ। বিগত সরকারের সময় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কাজ না করেই রাস্তার টাকা উঠিয়ে নিয়েছে ঠিকাদার। এখন এ সড়ক দিয়ে ৫টি ইউনিয়নের চলাচলকারী লক্ষাধিক মানুষের ভোগান্তি চরমে।
এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চলাচলকারী অটোচালক মিজান সরদার জানান, বৈঠাকাটা-নাজিরপুর ১৭ কিলোমিটার এ সড়কটি ৩০ মিনিটের পথ। কিন্তু রাস্তা ভাঙা এবং খানাখন্দের কারণে এক ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। এ ছাড়া রাস্তার কারণে প্রতিনিয়ত গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কাজটি শেষ করার জন্য ঠিকাদারের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা চলছে বলে জানায় এলজিইডি। সড়কের কাজ অতিশিগগির শুরু করা হবে জানালেও কাজ শেষ না করে টাকা উত্তোলনের বিষয়ে কথা বলতে রাজি নন পিরোজপুর জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজিজুর রহমান।
এ বিষয়ে নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাজিয়া শাহনাজ তমা বলেন, স্থানীয় সরকার বিভাগের যে সব কাজে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে এবং তদন্তাধীন রয়েছে সে সব কাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে তদন্ত শেষে কাজগুলো দ্রুত শেষ করার জন্য তৎপর রয়েছে প্রশাসন।
