More

    বরিশালের ৬টি অভয়াশ্রমে মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল

    অবশ্যই পরুন

    বরিশালের ৬টি অভয়াশ্রমে ইলিশসহ সব ধরনের মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা ৩০ এপ্রিল রাতের শেষ প্রহরে উঠে গেছে। এর ফলে আজ থেকে জেলেরা পুনরায় নদ-নদীতে মাছ শিকারে নামতে পারছেন। মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় ইতোমধ্যে হাজার হাজার নৌকা ও ট্রলার নিয়ে জেলে ও মৎস্যজীবীরা মেঘনা, কালাবদর, তেঁতুলিয়া ও বলেশ্বরসহ এ অঞ্চলের নদ-নদীতে নেমে পড়েছেন। এতে এই অঞ্চলের জেলে পল্লীতে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে।

    তবে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত সারা দেশে জাটকা আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধই থাকছে। মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশের আলোকে গত ১ নভেম্বর থেকে জাটকা আহরণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। অপরদিকে সামুদ্রিক এলাকায় বিপন্ন মাছের অস্তিত্ব রক্ষা ও মৎস্য সম্পদ সমৃদ্ধ করণে প্রজননকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের মৎস্য আহরণে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে গত ১৫ এপ্রিল রাতের প্রথম প্রহর থেকে; যা চলবে ১২ জুন পর্যন্ত। জাতীয় অর্থনীতিতে মৎস্য সেক্টরের অবদান এখন ২.৫৩ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে অবদান ২২.২৬ শতাংশ।

    এমনকি আমাদের খাদ্যে প্রাপ্ত প্রাণিজ আমিষের ৬০ ভাগই জোগান দেয় মাছ। মৎস্য বিজ্ঞানীদের সুপারিশে সমুদ্রে যাবার সময় পর্যন্ত যেসব এলাকায় ইলিশ পোনা ও জাটকা খাদ্য গ্রহণ করে বেড়ে ওঠে, সেগুলোকে ‘গুরুত্বপূর্ণ নার্সারি ক্ষেত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে।

    ষাটনল থেকে চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার, মদনপুর থেকে চর ইলিশা হয়ে চর পিয়াল পর্যন্ত মেঘনার শাহবাজপুর চ্যানেলের ৯০ কিলোমিটার, ভেদুরিয়া থেকে চররুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার এবং নড়িয়া থেকে ভেদরগঞ্জের নিম্ন পদ্মার ১২০ কিলোমিটার এলাকা এবং হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ ও বরিশাল সদর উপজেলার কালাবদর, গজারিয়া ও মেঘনা নদীর প্রায় ৮২ কিলোমিটার এলাকার ৬ষ্ঠ অভয়াশ্রমে মার্চ-এপ্রিল মাসে সব ধরনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ ছিল।

    এ ছাড়া খেপুপাড়ার আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার এলাকায়ও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে সব ধরনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় আমাদের জাতীয় মাছ ইলিশসহ সব মাছের প্রজনন ও প্রজননোত্তর পরিভ্রমণ নির্বিঘ্ন হওয়ায় উৎপাদন বৃদ্ধির সহায়ক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। মূল প্রজনন মৌসুম হিসেবে গণ্য করে গত বছর ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত উপকূলের ৭ হাজার ৩৩৪ বর্গকিলোমিটারের প্রধান প্রজননস্থলে সব ধরনের মৎস্য আহরণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সারা দেশেই ইলিশের আহরণ, পরিবহন ও বিপণন নিষিদ্ধ ছিল। ওই নিষেধাজ্ঞার পরপরই ১ নভেম্বর থেকে জাটকা আহরণে ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। পাশাপাশি দেশের ৬টি অভয়াশ্রমের ৪৩২ কিলোমিটার এলাকায় নভেম্বর থেকে পর্যায়ক্রমে সব ধরনের মৎস্য আহরণে ২-৩ মাস করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, যা গত ১ মে রাতের প্রথম প্রহর পর্যন্ত বলবৎ ছিল।

    ইলিশ ও জাটকা আহরণে গত দুই দশক ধরে নানা ধরনের বিধিনিষেধের ফলে দেশে ইলিশের উৎপাদন ও আহরণ প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেলেও গত দুটি অর্থ বছরে তা প্রায় ৭০ হাজার টন হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু এখনো দেশে আহরিত মোট ইলিশের ৬৬ শতাংশ থেকে ৬৮ শতাংশ আহরিত হচ্ছে বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ এবং উপকূলীয় নদ-নদী ও সংলগ্ন সাগর মোহনায়।

    তবে এবারও জাটকা আহরণ বন্ধসহ অভয়াশ্রমগুলোতে নিষিদ্ধকালীন সময়ে জেলে ও মৎস্যজীবীদের মধ্যে আইন অমান্যের প্রবণতা যথেষ্ট বেশি লক্ষণীয় ছিল। এমনকি দেশের বিভিন্ন এলাকায় জাটকা আহরণে বাধা দেওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। তারপরেও সরকার ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে যা কিছু করণীয় তা করবে বলে মৎস্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল মহল জানিয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের একটি দায়িত্বশীল সূত্রের মতে, গত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশের উপকূলীয় ৬টি অভয়াশ্রমে প্রায় হাজার খানেক অভিযান ছাড়াও প্রায় ৭৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২০ হাজার মিটার ইলিশ জাল, ৭৫ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ছাড়াও আরও প্রায় দেড় হাজার বিভিন্ন ধরনের জাল আটক ও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

    এ সময় প্রায় ২০ টন জাটকাসহ অন্যান্য মাছ জব্দ করা হয়। মোবাইল কোর্ট থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ছাড়াও অভিযানকালে প্রায় দেড় শ মামলা দায়ের করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। এ সময় বেশ কয়েকজন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। পাশাপাশি অভিযান পরিচালনাকালে ৮৯৩টি মামলাও দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে নদী ও সাগর মোহনায় মৎস্য সম্পদের অতি আহরণ বন্ধে সম্প্রতি ‘বিশেষ কম্বিং অপারেশন’ পরিচালনা করে সরকার।

    এই অপারেশনের আওতায় বরিশাল অঞ্চলে প্রায় ৩ হাজার অভিযান পরিচালনা কালে ১৭০টি মামলা দায়ের করা হয়। এ ছাড়াও সাড়ে ৪ শ মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইন অমান্যের দায়ে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা সহ ৬১ জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ অভিযানকালে প্রায় ২ কোটি মিটার কারেন্ট জাল ছাড়াও ৩ হাজার ২০০টি বেহুন্দি জাল ও প্রায় ১০ হাজার অন্যান্য ক্ষতিকর জাল আটক করে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এ সময় প্রায় ৪৩ টন জাটকাসহ আহরণ নিষিদ্ধ বিভিন্ন ধরনের মাছ বাজেয়াপ্ত করে আদালত।

    আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময়েও এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল অঞ্চলের পরিচালক জানিয়েছেন। পুলিশের পাশাপাশি নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও র‍্যাবসহ বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নদ-নদীতে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা বিরোধী অভিযানে নজরদারি অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে।

    মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, দেশে কারেন্ট জাল, বেহুন্দি জালসহ অন্যান্য ক্ষতিকর জালের সাহায্যে প্রতিবছর যে পরিমাণ জাটকা আহরণ হচ্ছে, তার এক-দশমাংশও যদি রক্ষা করা হয়, তবে ১ লাখ টন ইলিশের বাড়তি উৎপাদন সম্ভব। এদিকে বরিশাল উপকূলের ৪১টি উপজেলায় জাটকা আহরণে নির্ভরশীল জেলে পরিবারগুলোকে আহরণ নিষিদ্ধকালীন সময়ে খাদ্য সহায়তা হিসেবে সরকার ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত দুই দফায় প্রায় ৩৭ হাজার ৫০৮ টন চাল বিনামূল্যে বিতরণ করছে।

    ২ লাখ ৩৪ হাজার ৪২১ জেলে পরিবার মাসে ৪০ কেজি করে ৪ মাস এই খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন বলে মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে। পাশাপাশি ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র ও মাইগ্রেশন পথ নির্বিঘ্ন রাখা সহ সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মজুত ও জীববৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে নিঝুম দ্বীপ সংলগ্ন ৩ হাজার ১৮৮ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে দেশের প্রথম ‘সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বা মেরিন রিজার্ভ এরিয়া’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

    আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে শুধু ইলিশের অবদান এখন ১ শতাংশের বেশি এবং মৎস্য খাতে অবদান প্রায় ১২ শতাংশ। সারা বিশ্বে আহরিত ইলিশের প্রায় ৬০ শতাংশ এখনো বাংলাদেশেই উৎপাদন ও আহরিত হচ্ছে।

    সম্পর্কিত সংবাদ

    সর্বশেষ সংবাদ

    নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস : বরিশাল জেলায় ৮ ইভেন্টেই চ্যাম্পিয়ন বিসিসি

    সারাদেশে ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর বিশেষ উদ্যোগ ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ২০২৬’-এর বরিশাল জেলা পর্যায়ে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন...