বরিশালে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের নানামুখী অভিযান এবং বাহকদের গ্রেফতারসহ বিপুল মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পরেও এর বিস্তার রোধ করা দুরুহ হয়ে পড়ছে। এ অঞ্চলের গ্রামেগঞ্জেও এখন ‘হাত বাড়ালেই মাদক’ বলে একটি প্রবাদ ইতোমধ্যে বাস্তব রূপ লাভ করেছে। এমনকি সম্প্রতি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৩০ এপ্রিলের পরে মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যপী অভিযানের কথা ঘোষণার পরে ১ মে থেকে বিশেষ অভিযান শুরু হলেও এখনো তেমন বড় কোনো সাফল্য লক্ষণীয় নয়।
তবে বরিশাল মহানগরীর এয়ারপোর্ট ও কাউনিয়া থানা পুলিশ চলতি সপ্তাহেই ভিন্ন ভিন্ন অভিযানে বেশ কিছু ইয়াবা ও গাঁজাসহ-এর বাহকদের গ্রেফতার করেছে। এরমধ্যে সুদুর কক্সবাজারের টেকনাফ ক্যাম্প থেকে জাহিদা নামের ২০ বছর বয়সের এক তরুণী ১ হাজার পিস ইয়াবাসহ বরিশালে আসার পথে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশর হাতে আটক হয়েছে। বরিশাল মহানগর ও রেঞ্জ পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলের মতে কঠোর নজরদারি ও লাগাতার অভিযানের ফলে মাদককারবারিরা এখন অনেক সন্ত্রস্থ।
তারা ঘন ঘন রুট পরিবর্তন করছে। তারপরেও পুলিশের নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানিয়েছেন বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি ও মহানগর পুলিশ কমিশনারও। পুলিশ সূত্রের মতে, গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর এবং চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বরিশাল রেঞ্জের ৪৪টি ও মহানগরীর ৪টি থানায় মাদক পরিবহন, বহন, বিপনন ও সেবনের ঘটনায় জড়িত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ সংক্রান্ত ঘটনায় উল্লেখিত সময়ে ৩ হাজার ৫৮টি মামলাও দায়ের করা হয়েছে। যার বেশির ভাগই এখনো তদন্ত পর্যায়ে।
এ সময়ে প্রায় ৭শ’ কেজি গাঁজা ও ৫০টির মতো গাঁজা গাছও উদ্ধার করে পুলিশ। একই সময়ে দুই লক্ষাধিক পিচ ইয়াবা ছাড়াও প্রায় সাড়ে ৮ হাজার লিটার চোলাই মদ এবং ২১১ লিটার দেশী মদও উদ্ধার করে মহানগর ও রেঞ্জ পুলিশ। এছাড়াও ১২ বোতল বিদেশি মদ এবং প্রায় আড়াইশ বোতল ভারতীয় ফেনসিডিল, ২শ’ গ্রাম হেরোইন ও সাড়ে ১২শ’ মরফিন বা নেশা জাতীয় ইনজেকশনও উদ্ধার করে পুলিশ।
একই সময়ে ২১ ক্যান বিদেশি বিয়ার ছাড়াও মাদক বিক্রির প্রায় ২২ হাজার টাকা উদ্ধার করে বরিশাল মহানগর ও রেঞ্জ পুলিশ। তবে বরিশাল মহানরগরীসহ সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে শহর থেকে সুদুর পল্লী এলাকাতেও এখন মাদক বেচাকেনা ও তার অপব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। স্থলসীমান্ত এলাকা থেকে সড়কপথে এবং সাগর পথে মিয়ানমার ও সুন্দরবন সংলগ্ন সাগরপথে ইয়াবা ও ফেনসিডিলসহ নানা ধরনের মাদকের চালান অব্যাহত রয়েছে। সড়কপথে পুলিশ ও র্যাবের তৎপরতায় মাদক পাচারকারী ও পরিবহনকারীদের জন্য কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও নৌপথে তা এখনো অনেকটাই নিরাপদ।
নৌ পুলিশ ও বিভিন্ন জেলা পুলিশের নৌযান সংকটসহ নানামুখী সীমাবদ্ধতায় নৌপথকে এখনো পরিপূর্ণ নজরদারিতে আনা সম্ভব হয়নি। পুলিশের পাশাপাশি উপকূলরক্ষী বাহিনী-কোস্টগার্ডেরও তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও এখনো নৌপথকে মাদক পাচারকারীদের অপতৎপরতা মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি এখন মিয়ানমার থেকে ইয়াবা পাচার হয়ে সাগর পথে বরিশাল মহানগরীসহ সন্নিহিত এলাকায় পৌঁছছে। এমনকি সুদুর টেকনাফ থেকে নানা ছদ্মবেশে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষরা ইয়াবা নিয়ে বরিশালে আসছে। অত্যন্ত সহজে পরিবহনযোগ্য ও সহজলভ্য হবার কারণে ইয়াবার অপব্যবহারও ক্রমশ বাড়ছে।
পুলিশের ব্যপক তৎপরতার মধ্যেও শহর থেকে গ্রামেগঞ্জে সর্বত্রই ইয়াবার বিপনন অব্যাহত রয়েছে। ফুটপাতের চায়ের দোকান ও পান-সিগারেটের দোকান থেকে শুরু করে অনেক নামি দামী প্রতিষ্ঠানেও ইয়াবা বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সাথে টেলিফোনে আলাপ করা হলে তিনি জানান, ‘পুলিশ ও নৌ পুলিশের নানা সীমবদ্ধতার মধ্যেও আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি মাদক পরিবহন, বিপনন বন্ধে।
১ মে থেকে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, পুলিশ, নৌ পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ের মাধ্যমে আমরা কাজ করে যাচ্ছি’। মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকেও মাদকবিরোধী যেকোনো অভিযানে সম্পৃক্ত করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে আমরা জিরো টলারেন্স নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি’। এ ব্যাপারে বরিশাল মহানগর পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, ‘মাদক নিয়ে বিএমপি জিরো টলারেন্স নিয়ে কাজ করছে।
তবে পুলিশকে আরো অনেক কিছু নিয়েই কাজ করতে হয়। তার মধ্যে মাদক অন্যতম হলেও শুধু পুলিশের পক্ষেই তা নির্মূল করা দুরুহ’। ‘মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি’। আর এ ক্ষেত্রে ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে আরো সক্রিয় হবার ওপরও গুরুত্বারোপ’ করেন বিএমপি কমিশনার। তবে মাদক উদ্ধার ও এরসাথে সংশ্লিষ্ট বিপুল সংখ্যক বাহককে গ্রেফতার করা হলেও মূল হোতাদের বেশির ভাগই থাকছেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
এ ব্যপারে বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি জানান, ‘আমরা তদন্তের মাধ্যমে মূল হোতাদের ধরে আনারও চেষ্টা করছি। শুধু মাদক কারবার নয়, এর মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের বিষয় নিয়ে মানি লন্ডারিং আইনের আওতার আনার বিষয়ে পিবিআইকে দিয়েও আমরা কাজ করে যাচ্ছি, বলেও জানান রেঞ্জ ডিআইজি।
